রাস্তায় থাকা মানুষদের জন্য ফুটপাতেই ইফতার, অচেনারাও হয়ে ওঠেন আপন
· Prothom Alo
খুলনা নগরের অন্যতম কেন্দ্রস্থল শিববাড়ী মোড়। তখনো থামেনি শহরের ব্যস্ততা। ইজিবাইকের হর্ন, রিকশার ঘণ্টার টনটনানি, মানুষের ছুটে চলা—সব মিলিয়ে এক অব্যাহত কোলাহল। মেঘলা আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে গোধূলির দিকে ঝুঁকছে। ঠিক সেই ব্যস্ততার মধ্যেই ফুটপাতে বিছানো সবুজ ত্রিপল, তার ওপর সাজানো সারি সারি প্লেট। কলা, খেজুর, জিলাপি, ছোলা, পেয়ারা, গাজর, আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু—সবই যেন আমন্ত্রণ করছে ক্লান্ত চোখকে। পাশে সাজানো রয়েছে শরবত ও পানির বোতল।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
ধীরে ধীরে ভিড় জমছে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক ও পথচারীদের। কেউ বসে পড়ছেন ফুটপাতে, কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। আর অপেক্ষা মাগরিবের আজানের। মঙ্গলবার বিকেলে রমজানের শেষ মুহূর্তে ফুটপাতে তৈরি হচ্ছিল একধরনের নীরব, শান্ত ও মন ভরানো প্রস্তুতি।
রমজানে জীবিকার তাগিদে যাঁদের ইফতারের সময়ও রাস্তায় থাকতে হয়, মূলত তাঁদের জন্যই এ আয়োজন। খুলনা ফুড ব্যাংক ও খুলনা ব্লাড ব্যাংকের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যে এই ইফতারের আয়োজন করছেন।
পাশেই রেলস্টেশন থেকে ভেসে আসা সাইরেনের শব্দ আর মসজিদের আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই সবাই একসঙ্গে পানি মুখে দেন। কেউ কারও নাম জানেন না। তবু সবাই একসঙ্গে, এক আসনে বসে। অপরিচিত হলেও যেন সবাই আত্মীয়। যেন এক কাতারের আপনজন। ইফতারের সময় কেউ দোয়া করেন, কেউ ভাগ করেছেন তাঁদের ঈদের পরিকল্পনা।
আয়োজকেরা জানান, প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ রোজাদারের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়। এতে খরচ হয় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা। পুরো রমজান মাস এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
খুলনা ফুড ব্যাংকের অর্থ সম্পাদক মো. আসাদ শেখ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো রাস্তায় থাকা রোজাদারদের সম্মানজনকভাবে ইফতার নিশ্চিত করা। দিনমজুর, চালক ও পথচারী—যাঁদের ইফতারের সময়ও কাজ করতে হয়, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই মূল উদ্দেশ্য। এ বছর শিববাড়ী মোড় ছাড়াও পাবলিক কলেজ মোড়ে এই আয়োজন করেছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে দৌলতপুর নতুন রাস্তা, রয়েল মোড় ও রেলওয়ে স্টেশনেও ইফতারের কার্যক্রম চালুর।’
প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোজাদারের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়। এতে খরচ হয় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা। মঙ্গলবার খুলনা নগরের শিববাড়ী মোড়েসংগঠনের সদস্যরা জানান, ইফতার বিতরণের পাশাপাশি সংগঠনের উদ্যোগে ইফতারসামগ্রীর বস্তাও দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ জনকে দেওয়া হয়েছে, লক্ষ্য ২ হাজার জনকে দেওয়ার। প্রতিটি বস্তায় থাকছে এক কেজি তেল, এক কেজি লবণ, দুই কেজি পেঁয়াজ, পাঁচ কেজি আলু এবং এক কেজি করে ছোলা, মুড়ি ও চিনি। দরিদ্র রোজাদারদের ঠিকানা সংগ্রহ করা হয় এবং গোপনে তাঁদের বাড়িতে ইফতারিসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের জন্যও সামগ্রী দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
খুলনা ফুড ব্যাংক, ব্লাড ব্যাংক ও অক্সিজেন ব্যাংকের সভাপতি সালেহ্ উদ্দিন (সবুজ) বলেন, ‘হতদরিদ্র মানুষের অধিকার নিয়ে আমরা কাজ করি। রমজানজুড়ে নানা কার্যক্রমের মধ্যে প্রতিদিন রাস্তায় থাকা মানুষের জন্য ইফতার অন্যতম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা যুক্ত আছেন। কেউ ১০০ জনের, কেউ ১৫০ জনের ইফতারের দায়িত্ব নেন।’
সালেহ্ উদ্দিন আরও বলেন, করোনার সময় থেকে প্রতিবছর এই কার্যক্রম চালছে। শুরুর দিকে ২০-৩০-৫০ করে এবার পরিধি আরও বাড়ছে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জনকে ইফতার দেওয়া হচ্ছে। এবারই একদিন ৫০০ জনকে ইফতার দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
শিববাড়ীতে ইফতার করতে আসা নির্মাণশ্রমিক মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, ‘সারা দিন কাজে থাকি। অনেক সময় বাসায় গিয়ে ইফতার করা সম্ভব হয় না। এখানে ইফতার পেয়ে খুব উপকার হয়।’
একজন ভ্যানচালক বলেন, ‘এখানে ইফতারের ব্যবস্থা থাকায় অন্তত ইফতারের চিন্তা করতে হয় না। আল্লাহ যেন তাঁদের ভালো রাখেন।’
ইফতার শেষে সবাই ধীরে ধীরে তাঁদের গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন। কেউ মসজিদে নামাজে যাচ্ছেন, কেউ আবার দ্রুত কাজে ফিরে যাচ্ছেন। ফুটপাতের ওই ছোট্ট ত্রিপল, সারি সারি প্লেট—সবই তখনো পড়ে আছে মানবিকতার এক নীরব নিদর্শন হয়ে।