বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে পাঠ করা—ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, লেখক ও অধ্যাপক
· Prothom Alo

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী একাধারে অধ্যাপক ও লেখক। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) তড়িৎকৌশল বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। পাশাপাশি বিজ্ঞানসাহিত্য ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতেও তাঁর অবাধ বিচরণ। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে দেশে যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা ছিল হাতে গোনা; তখন থেকেই তিনি এ ধারায় যুক্ত হন। তাঁর লেখায় উঠে আসে মহাবিশ্বের রহস্য, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও প্রযুক্তির বিচিত্র সব অনুষঙ্গ।
Visit playerbros.org for more information.
তাঁর নিজের শৈশব, শিক্ষকতাজীবন, লেখালেখির জগৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে বিজ্ঞানচিন্তার কাছে খোলাখুলি কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার ও সহসম্পাদক কাজী আকাশ।
কেমন আছেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমি ভালো আছি, সুস্থ আছি।
আপনি সম্প্রতি বিজ্ঞানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: এটা বেশ আনন্দদায়ক। কৃতজ্ঞতা তো বটেই। লেখক কমিউনিটি, পাঠক ও বন্ধুদের জন্য এটি একটি বড় উল্লম্ফন। এর মাধ্যমে মূলত একটি ভালো অর্জনের স্বীকৃতি আসে, এটা দরকার আছে। জীবিত লেখকদের অবশ্যই পুরস্কার দেওয়া উচিত, মৃত্যুর পর পেয়ে কোনো লাভ নেই।
আপনার লেখালেখির শুরুটা জানতে চাই। আপনি তো অনেক দিন ধরেই বিজ্ঞান নিয়ে লিখছেন। এ ব্যাপারে লেখার আগ্রহটা কীভাবে তৈরি হলো?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমার ফরমাল লেখালেখি শুরু ১৯৯৩ সালে। কারণ, সে বছরই বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান পত্রিকায় আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি ছিল স্টিফেন হকিংয়ের একটি বড় ও পূর্ণাঙ্গ লেকচার, ‘ইজ দ্য এন্ড ইন সাইট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিকস’-এর অনুবাদ। ওটাই ছিল বড় কোনো পত্রিকায় আমার প্রথম লেখা। তাই ওটাকেই লেখালেখির প্রথম ধাপ হিসেবে ধরা যেতে পারে।
তবে লেখালেখির হাতেখড়ি আরও আগে। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই আমি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। আসলে তখন আমার অনুবাদের হাত তেমন ভালো ছিল না। স্কুলে কম্প্রিহেনশন রাইটিংয়ের অনুশীলনের জন্য মা বাড়িতে ইংরেজি পত্রিকা রাখতেন। সেখান থেকে অনুবাদ করতে বলতেন। বাড়িতে তখন বাংলা পত্রিকা রাখা হতো না, যাতে ইংরেজিতে আমি সড়গড় হই। সেই ইংরেজি থেকে অনুবাদ চর্চার মাধ্যমেই আমার লেখার শুরু হয়েছে বলে মনে হয়।
কিন্তু আমি কেন লেখক হলাম? এটা আসলে খুব পরিষ্কার করে বলতে পারব না। বই পড়ার অভ্যাস ছিল, সম্ভবত সেখান থেকেই এটা হয়ে গেছে। লেখক হবই, ছোটবেলায় এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
প্রকৃতির ভাষা বুঝতে হলে, গণিতের ভাষা বুঝতে হবে —মুস্তাফা আমিন, মহাকাশবিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রলেখালেখির পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানে আপনার খুব আগ্রহ দেখতে পাই। তার পেছনের কারণ কী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আমার আগ্রহ সম্ভবত কার্ল সেগান ও স্টিফেন হকিংয়ের বই পড়ার সময় থেকে। তারও আগে যদি বলতে হয়, তবে আমার মাতামহের লাইব্রেরির কথা বলতে হবে। সেখানে আমি ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত পড়তাম। তাঁর জীবনকাহিনি ও রুবাইয়াত বইটি আমাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি দারুণভাবে টেনেছিল। এরপর ধীরে ধীরে কার্ল সেগান ও স্টিফেন হকিংয়ের বইগুলো আত্মীকরণ করতে থাকি।
আসলে রাতের আকাশ সবার কাছেই দারুণ আকর্ষণের জায়গা। তখনকার ঢাকা শহর তো এখনকার মতো ছিল না। তখন হয়তো কালপুরুষ বা সিরিয়াস দেখা যেত। রাতের আকাশ কিছুটা হলেও পরিষ্কার ছিল। সেই অন্ধকার আকাশে তাকিয়ে ভাবতাম, একেকটা মহাজাগতিক বস্তু যেন প্রকৃতির এক গোপন ভাষা আমাদের জানাচ্ছে। কিশোর মনে প্রকৃতির এই ভাষা বোঝার আনন্দটা বেশ প্রভাব ফেলেছিল।
আপনি বুয়েটে তড়িৎকৌশল পড়ান, আবার নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি নিয়ে আগ্রহী। এ দুটি ভিন্ন জগৎ কীভাবে মেলান?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমি যে নিজের পড়ার বিষয়ের বাইরে লিখি, তা কিন্তু বিজ্ঞানের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকেই আসে। তবে হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমার পড়ার বিষয় তড়িৎকৌশল নিয়ে লেখা বেশ কম। একদমই যে নেই, তা নয়। এই বিষয়ের ওপরও আমার ‘সলিড স্টেট সিরিজ’ নামে কিছু বই আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পাঠকের অভাবে বইটা খুব একটা চলছে না। তবু যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। ইলেকট্রনিকস নিয়ে একটি পাঠ্যবইয়ের কাজ বর্তমানে যৌথভাবে চলছে। এটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বইটি শেষ হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
আসলে জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল আমার প্যাশন। ১৯৯৪ সালে আমি বুয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ইউনিভার্সিটির ক্লাস শুরুর আগে কলকাতায় চতুর্থ সারা ভারতের শৌখিন জ্যোতির্বিদ সম্মেলন (অল ইন্ডিয়া অ্যামেচার অ্যাস্ট্রোনমার্স মিটিংয়ে) অংশ নিই শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে। আমি ছিলাম বাংলাদেশের প্রতিনিধি। সেখানে অনেকের সঙ্গে কথা হয়। একজনের হাতে একটি ইংরেজি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ডিকশনারি দেখে মনে হয়েছিল, বাংলায় কি এমন কিছু লেখা যায় না? মূলত সেই ভাবনা থেকেই আমার ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দকোষ’ লেখা শুরু। পরে তা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। মহাকাশ নিয়ে লেখার প্রতি কৌতূহল তৈরি হয় সেই লেখা থেকেই।
সত্যি বলতে, তড়িৎকৌশল পড়ার তেমন কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দশম হয়েছিলাম এবং সেখানে পদার্থবিজ্ঞান পড়ার সুযোগ পেতাম। কিন্তু তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ছিল বেশ অগ্নিগর্ভ। চারদিকে সশস্ত্র সংগ্রাম চলত। আমি যেহেতু মা–বাবার একমাত্র সন্তান, তাই আমাকে নিয়ে তাঁরা খুব ভয়ে থাকতেন। আমার বাবাও ছিলেন একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তাই অনেকটা পারিবারিক ইচ্ছাতেই আমি তড়িৎকৌশলে ভর্তি হই। তবে তখনকার দিনে বিএসসি শেষ করার পর আবার অ্যাস্ট্রোনমিতে মাস্টার্স বা পিএইচডি করার মতো যে সাহস প্রয়োজন ছিল, সেটা আমার ছিল না। তবে এখন আমার অনেক শিক্ষার্থী এই সাহসের কাজটি করছে।
বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার কৌতূহল বজায় রাখা—সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন, অধ্যাপক, সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রলেখক, শিক্ষক এবং শখের জ্যোতির্বিদ—এই তিন পরিচয়ের মধ্যে কোনটি আপনার প্রিয়?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: এটি আসলে বেশ কঠিন প্রশ্ন। একেক জায়গায় আমি একেক রকম পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করি। প্রথম আলোয় গেলে আমি একজন লেখক, মন্ত্রণালয়ে গেলে অধ্যাপক আর মাঠে–ময়দানে শখের জ্যোতির্বিদ। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি নিজেকে একজন গ্রন্থকীট হিসেবে পরিচয় দিতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি।
বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো সহজ করে লেখার জন্য আপনি জনপ্রিয়। বই লেখার সময় কি নির্দিষ্ট কোনো পাঠকগোষ্ঠীর কথা মাথায় রাখেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: ছোটদের জন্য আমার লেখালেখি খুব কম। সাধারণত আমার মূল লক্ষ্য থাকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। বড়জোর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নামা যায়, কিন্তু এর চেয়ে ছোটদের জন্য আমার লেখা বেশ কম। সত্যি বলতে, খুব ছোটদের জন্য লেখার পরিকল্পনা আমার তেমন একটা থাকে না।
তবে মাঝেমধ্যে যখন ভেতর থেকে বিশেষ কোনো অনুপ্রেরণা পাই বা মনে হয় যে এই বিষয় শিশুদের জানানো দরকার, তখন আমি ছোটদের জন্য লিখি। যেমন একটাই পৃথিবী কিংবা তোমাদের জন্য বিজ্ঞান বইটি আমি পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণির শিশুদের জন্য লিখেছি। যখন কোনো নির্দিষ্ট বয়সের কথা মাথায় রেখে লিখি, তখন তাদের পাঠ্যপুস্তকগুলো ভালো করে দেখে নিই। এতে বইয়ের গভীরতা কতটুকু রাখা যাবে বা ভাষা কতটা সহজ করা প্রয়োজন, তা বুঝতে সুবিধা হয়।
তবে লেখার মান নিয়ে আমি একটি বিষয়ে খুব সচেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথা আছে, ‘নৌকাটাকে কখনো একদম হালকা করা যাবে না।’ আমি ঠিক এই কথাই মেনে চলি। ছোটদের জন্য লিখতে গিয়ে আমি কখনোই বিষয়বস্তুকে খুব বেশি হালকা করে ফেলি না। জ্ঞানের গুরুত্ব বজায় থাকা জরুরি।
আমরা পৃথিবীর বাইরে এমন জায়গা খুঁজছি যেখানে প্রাণ থাকতে পারে—নোজাইর খাজা, গ্রহ বিজ্ঞানীআপনার কিছু অনুবাদ বই আছে। বিজ্ঞানের বই অনুবাদ করা চ্যালেঞ্জিং। অনুবাদের সময় আপনি কোনটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমার অনুবাদগ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশি নয়। অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি আশীষ লাহিড়ীর নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি। তিনি বলেছিলেন, অনুবাদের সময় প্যারা অনুবাদ করবেন। মানে প্যারাগ্রাফ অনুবাদ করবেন। আক্ষরিক অনুবাদ করতে গেলে অনেক সময় মূল ভাব ঠিকঠাক মেলাতে পারবেন না। প্রাঞ্জল হতে হবে। সেটা না হলে অনুবাদ হবে না। ইংরেজির কিছু চমৎকার শব্দ আমরা অত্যন্ত ভারী তৎসম শব্দে ভারাক্রান্ত করে ফেলি। এতে মূল বিষয়টা সহজে বোঝা যায় না। আমি যে অনুবাদই করি না কেন, এই রিডেবিলিটি ও আন্ডারস্ট্যান্ডেবিলিটি আমাদের থাকতে হবে। এ জন্য আশীষ লাহিড়ী যে রেসিপি দিয়েছেন, তা মেনে চলা উচিত।
বিজ্ঞান নিয়ে প্রচুর কাজ করলেও আপনি কি কখনো সায়েন্স ফিকশন লেখার কথা ভেবেছেন? নাকি বিজ্ঞান নিয়েই থাকতে চান? সামনে আপনি কী বিষয়ে বই লিখবেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: সায়েন্স ফিকশন লেখার একটা ইচ্ছা আছে। আইডিয়া গোছানোর জন্য সময় দরকার। আমি তো আসলে কথাসাহিত্যিক নই, তাই এটাকে কীভাবে ফোটানো হবে, গল্পটা আদৌ গল্প হবে কি না, সেটা নিয়ে আমি একটু ভাবি। যদিও এর আগে ১৯৯৮–৯৯ সালে আমি ‘সুমন ইকুয়েশন’ ও ‘মাত্রিক পরিণতি’ নামে দুটি গল্প লিখেছিলাম। একটি মহাকাশ বার্তা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। আসলে সায়েন্স ফিকশন নিয়ে আগে আমার কিছুটা নেতিবাচক মতামত থাকলেও এখন এটা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে।
আপনি দীর্ঘদিন জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের সঙ্গে যুক্ত। গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গেও কাজ করেছেন। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের মেধা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? বিশ্বমঞ্চে আমাদের অবস্থান কি আরও ভালো করা সম্ভব? আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমার যোগাযোগ একদম ওপর ওপর। আমি মূলত তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে গিয়ে বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর দিতাম। তবে জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমি শুরু থেকেই খুব নিবিড়ভাবে যুক্ত। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা মেধার দিক থেকে অসাধারণ, কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের দেশে কোনো সঠিক শিক্ষামূলক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। একটি শিশুর মেধা বিকাশের জন্য তার মা–বাবা, স্কুল, পারিপার্শ্বিকতা এবং বন্ধুবান্ধব থেকে যে সহযোগিতা বা উৎসাহ দরকার, তার বড় অভাব রয়েছে এখানে।
আমাদের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হাতে-কলমে বিজ্ঞানচর্চার অভিজ্ঞতা। স্কুলগুলোতে সাধারণত ল্যাবরেটরি ক্লাস করানো হয় না। ফলে কোনো কিছুর সঠিক পরিমাপ করা বা নির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে পরীক্ষা করার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা তাদের গড়ে ওঠে না। আমরা অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতির সময় তাদের যখন ট্রেনিং দিই, সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য। তা ছাড়া স্কুলের পরীক্ষা ও পড়াশোনার চাপের কারণে শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে বের করে আনাও বেশ কঠিন। এই শিক্ষামূলক পরিবেশ উন্নত করতে না পারলে বিশ্বমঞ্চে বড় সাফল্য পাওয়া মুশকিল।
আমরা লক্ষ করছি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের সর্বোচ্চ নম্বর সব সময় ১০০–তে ৮৬ থেকে ৮৭-এর মধ্যেই আটকে থাকে। অথচ স্বর্ণপদক জিততে হলে ৯০-এর কাছাকাছি নম্বর পেতে হয়। এই যে আমরা পিছিয়ে পড়ছি, তার প্রধান কারণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা। যেহেতু জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডে প্রায় ৪০ শতাংশ নম্বর থাকে দলীয় কাজ বা হাতে-কলমে পরীক্ষার ওপর, তাই সেখানেই আমাদের শিক্ষার্থীরা বারবার বাধা পাচ্ছে। এই দিকগুলোর উন্নতি করা দরকার।
‘ইনফিনিট স্ক্রলিং মানুষের জন্য ক্ষতিকর’—আমান্ডা বগান, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনআমাদের দেশে বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে নাকি কমছে? বিজ্ঞানের ছাত্র কমে যাওয়া নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ আদতে বাড়ছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। এটি বুঝতে হলে দেশজুড়ে বড় ধরনের একটি সার্ভে করা প্রয়োজন। তবে আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ কমছে। তখন সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা ধরনের সাময়িক ব্যবস্থা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আমার মতে, বর্তমানে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাই বেশ নাজুক। শুধু বিজ্ঞান নয়, যেকোনো ধরনের শিক্ষার প্রতিই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এখন তলানিতে। এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। আমি শিক্ষা সংস্কারের জন্য ১০ থেকে ১২টি বিশেষ সূত্রের কথা বলেছি। আমার মনে হয়, আমাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো উচিত। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম কিংবা মাদ্রাসা—সব মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা এই স্তর পর্যন্ত একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করবে।
অষ্টম শ্রেণির পর একটি সনদ পরীক্ষা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের মেধা ও ঝোঁক যাচাই করা হবে। এরপর দ্বাদশ শ্রেণির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। নবম থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবাই একই স্ট্রিমের পড়াশোনা করবে। কেবল দ্বাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা একাধিক স্ট্রিমে ভাগ হবে, যাদের সঙ্গে প্রচলিত বিজ্ঞান বা মানবিক বিভাগের মিল আছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এ দেশের জনশক্তির একটি বড় অংশ অদক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যায়। তাই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে তাদের স্বাস্থ্যবিধি, গণিতের প্রাথমিক ধারণা এবং হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখিয়ে তৈরি করতে হবে। কেননা অনেকেই জানে না প্যারাসিটামল দিনে কয়টা খেতে হবে, খাওয়ার স্যালাইন কীভাবে বানাতে হয়। এগুলো জানা জীবনধারণের জন্য খুবই জরুরি। পাশাপাশি যারা মেধাবী, তাদের জন্য ছোটবেলা থেকেই যেন বুদ্ধিভিত্তিক ও গবেষণাধর্মী চিন্তার চ্যালেঞ্জ থাকে, সেই পথও খোলা রাখতে হবে।
অনেক জায়গায় কাজ করে ও শিখে নিজের মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করেছি—রসায়নে নোবেলজয়ী সুসুমু কিতাগাওয়াআপনি বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মশালা আয়োজন করে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমার কথা বলার বেশি কিছু নেই। ১৯৮৪ সালের দিকে আমাদের প্রয়াত এফ আর সরকার স্যার এটা তৈরি করেছিলেন। তখন ডক্টর এ আর খান স্যার ছিলেন, আবদুল জব্বার স্যার বেঁচে ছিলেন। তাঁদের নিয়ে একটা সভার মতো করেছিল বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি। হ্যালির ধূমকেতু দেখার সময় থেকে এটা চলছে। সরকার স্যার ও জব্বার স্যার এসব নিয়ে কিছু কাজ করেছেন। তবে তাঁরা কখনোই মাঠপর্যায়ে কাজ করেননি। সোসাইটির কাজ হচ্ছে সেমিনার করা। এ মুহূর্তে আমরা ওটাকে একটু মার্জ করেছি আমাদের ন্যাশনাল আউটরিচ কো–অর্ডিনেটর অফিসের সঙ্গে। আমাদের প্ল্যান হচ্ছে, যাঁরা আমাদের অ্যালামনাই আছেন, তাঁদের সংগঠিত করে বাসের (বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি) মেম্বারশিপ করা। আর আমরা তো সব শৌখিন জ্যোতির্বিদই এখানে!
বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ কতটা? কোনো কিশোর যদি ভবিষ্যতে মহাকাশবিজ্ঞানী হতে চায়, তবে এখন থেকে তার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বর্তমানে জ্যোতির্বিদ হওয়ার অনেক নতুন পথ খুলে গেছে। আমাদের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী কিন্তু ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিল। তারা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বিদেশে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছে। তারা আমাদের জন্য একেকটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড। শুধু তা–ই নয়, এখন পদার্থবিজ্ঞান বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও অনেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গড়ছে।
বর্তমানে আইইউবির কাসা (CASAA) স্নাতক বা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। এটা সত্যিই ভালো উদ্যোগ। যদিও তারা এ মুহূর্তে সরাসরি জ্যোতির্বিজ্ঞানে কোনো ডিগ্রি দিচ্ছে না, তবে পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে মেজর বা মাইনর বিষয় হিসেবে এটি পড়ার সুযোগ রাখছে। হয়তো ভবিষ্যতে তারা পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রিও চালু করবে। ফলে যারা ফিজিকস বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যেকোনো শাখায়, বিশেষ করে ইলেকট্রিক্যাল বা মেকানিক্যাল পড়ছে, তারা চাইলেই ভবিষ্যতে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নিজেদের যুক্ত করতে পারবে।
ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য আমি বলব, কেউ যদি পদার্থবিজ্ঞান অথবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যেকোনো শাখা নিয়ে পড়াশোনা করে, তবে সে সহজেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে আসতে পারবে। কারণ, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে তথ্য বিশ্লেষণ এবং গণিতের ওপর দারুণ দখল তৈরি হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় এই বিষয়গুলো খুব কাজে লাগে। তবে ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিকস বা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিকসের কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে। এগুলো যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠ্যক্রমে থাকে না, তাই আগ্রহী শিক্ষার্থীদের এগুলো আলাদাভাবে শিখে নিতে হবে। এমনিতে অন্য ডিসিপ্লিনে পড়ছে কোনো কারণে কিন্তু অ্যাস্ট্রনমি পড়তে চায়, তাদের জন্য সহজ উপায় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সিলেবাস অনুসরণ করে নিজেই প্রস্তুতি নেওয়া। অন্তত পরিচিতিটা তৈরি হবে।
আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা হলো, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে এখনো জ্যোতির্বিজ্ঞান সাবজেক্ট হিসেবে নেই। সব জায়গায় এটি কেবল উচ্চতর গবেষণার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে। আমরা যখনই এটি স্নাতক পর্যায়ে চালুর চেষ্টা করি, তখনই একটি অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ে শিক্ষার্থীরা চাকরি পাবে কোথায়? তারা কি বিদেশে যাবে, বিসিএস দেবে, নাকি ব্যাংকে চাকরি করবে? আমার মতে, তারা ব্যাংকে বা বিসিএসে গেলেও কোনো সমস্যা নেই; জ্ঞান তো বিফলে যায় না।
দেশের বাইরে যেতে হবে নয়তো ব্যাংক বা বিসিএস দিতে হবে, তাতে আমি কোনো অসুবিধা দেখি না। কিন্তু স্নাতকদের প্লেসমেন্টের কোনো জায়গা নেই। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটিতে বা ভুটানেও এখন ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। থাইল্যান্ড বা ভারত তো অনেক এগিয়ে। আমাদের এখানে ‘কাসা’ ছাড়া আর কোনো একাডেমিক জায়গা নেই। নভোথিয়েটারগুলোতেও আমরা সেভাবে সুযোগ পাচ্ছি না। আমাদের এখানে কাসা ছাড়া শিক্ষার্থীদের বসার মতো কোনো একাডেমিক জায়গাও নেই। এমনকি দেশের নভোথিয়েটারগুলোতেও তাদের কাজ করার তেমন কোনো সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এমনকি শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার জন্য অন্যদেশের প্লানেটারিয়ামগুলো যেমন উদ্যোগী, আমাদের দেশে তেমন উদ্যোগ একদমই চোখে পড়ে না। এই জায়গায় নভোথিয়েটারের অনেক কাজ করার আছে।
‘নোবেল জয়ের খবর শুনেও স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগায়নি’—পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী জন মার্টিনিসএ সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় আছে কি?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: সরকারি ও বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। নভোথিয়েটারগুলোকে যদি আউটরিচ সেন্টার হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে কাজ করা সম্ভব। আমরা দুই বছর ধরে জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর ও নভোথিয়েটার কর্তৃপক্ষের কাছে গেছি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের সমঝোতা স্মারক তৈরির জন্য। আমি সচিব পর্যায় পর্যন্ত গেছি, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও এক অজানা ভয়ে তারা পিছিয়ে যায়। আমাদের স্বায়ত্তশাসন লাগবে না, শুধু কী করতে হবে, সেটা বলে দেওয়ার সুযোগ দিলেই হয়। বিশ্বের সব দেশে এই অবজারভেটরি বা সায়েন্স মিউজিয়ামগুলোই শিশুদের বিজ্ঞান শেখার মাধ্যম এবং অলিম্পিয়াড সেন্টার। কিন্তু আমাদের এখানে আমরাই ঢুকতে পারি না। এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার।
আমরা বিভিন্ন অলিম্পিয়াড বেসরকারিভাবে করছি। আমাদেরও একদিন এটা হোস্ট করতে হবে। এগুলো হোস্ট করতে সরকারি প্রণোদনা ও লজিস্টিক সাপোর্ট অবশ্যই প্রয়োজন। এটা একটা বিশাল ইনভলভমেন্ট। বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা, আবাসন এবং পরীক্ষার জন্য কয়েক শ পরীক্ষণ সেট তৈরি করতে হবে। অনেক মন্ত্রণালয় এর সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করতে হবে।
‘আমাদের ডজনখানেক সদস্যকে পোষা পশুর সঙ্গে একটি ছোট্ট ঘরে থাকতে হতো’—রসায়নে নোবেলজয়ী ওমর ইয়াঘিএবার একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। আপনার শৈশব, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চাই। ছোটবেলায় প্রকৌশলী হতে চেয়েছিলেন নাকি বিজ্ঞানী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমার জন্ম ঢাকায়, ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বিডিআর গেটের ঠিক উল্টো দিকের একটি বাড়িতে। জায়গাটি ঠিক ২ নাকি ৩ নম্বর রোড ছিল, তা আজ আর মনে নেই। কারণ, সেই পুরোনো ক্লিনিক ও বাড়িঘর ভেঙে এখন সেখানে বড় বড় অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। আমার শৈশবের কিছুটা সময় কেটেছে ঘোড়াশালে আর একটা বড় অংশ লিবিয়াতে। এরপর দেশে ফিরে দুই বছর নানাবাড়িতে থেকে খুলনা জেলা স্কুলে পড়েছি। অবশেষে ’৮৫ সালের দিকে আমরা ঢাকায় থিতু হই। এরপর যথাক্রমে পড়াশোনা ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুল, মনিপুর হাইস্কুল ও নটর ডেম কলেজে।
ছোটবেলায় আর দশটা শিশুর মতো আমারও অদ্ভুত সব স্বপ্ন ছিল। কখনো ইচ্ছা হতো ট্রেনের ড্রাইভার হব, আবার কখনো দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। বিজ্ঞানী হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য তখন ছিল না। পরিস্থিতির কারণেই আমি বইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম। মনিপুর হাইস্কুলে পড়ার সময় আমার খুব খেলার শখ ছিল। কিন্তু হকিস্টিক নিয়ে না খেলার পরামর্শ দেওয়ায় আমার খেলার জগৎটা বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকেই বই হয়ে ওঠে আমার পরম বন্ধু। আমার মাতামহ বলেছিলেন, আমি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হব; শেষ পর্যন্ত তাঁর কথাটাই ফলে গেল।
আমাদের কাজের প্রভাব যে আগামী ৪০ বছর ধরে চলবে, তা কল্পনাতেও ছিল না—পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী জন ক্লার্কশিক্ষক হিসেবে আপনি কেমন? ক্লাসরুমে কড়া শাসন করেন নাকি ছাত্রদের বন্ধু হয়ে পড়ান?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: শিক্ষক হিসেবে আমি কেমন, তা নিয়ে প্রশ্ন না করাই বোধ হয় ভালো। কারণ, ক্লাসরুমে আমি সম্ভবত খুব একটা সুবিধের নই। ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ হয়তো আমাকে ভালো বলে, আবার অনেকেই হয়তো খুব একটা পছন্দ করে না। অনেকটা কবিতার মতো, ‘ফুলের মালাগাছি বিকাতে আসিয়াছি, পরখ করে সবে, করে না স্নেহ।’। সেই জীবনটাও বোধ হয় এমনই। শিক্ষকতায় আমার কিছুটা স্ট্রিক্টনেস আছে। আমি আসলে চাই, আমার শিক্ষার্থীরা একটা ধাক্কা খেয়ে শিখুক। তবে এই কড়া ধাঁচের শিক্ষকতা সব সময় সবার কাছে জনপ্রিয় হয় না। তবে তা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপও নেই।
মহাবিশ্বের কোন রহস্যটা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি ভাবায়? ব্ল্যাকহোল, ডার্ক ম্যাটার নাকি অন্য কিছু?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে আমাদের সবার মনেই একটি চিরন্তন প্রশ্ন জাগে, এই সবকিছুর মানে কী? মার্কিন পদার্থবিদ স্টিভেন ওয়েইনবার্গ বলেন, ‘এর কোনো মানে নেই। কোনো উদ্দেশ্য নেই।’ আসলে এত কিছুর কোনো মানে নেই, এটাও তো একটা বড় প্রশ্ন। আমরা এই মহাবিশ্বকে গণিতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারি। আমরা অঙ্ক কষে মহাবিশ্বের জটিল সব সমীকরণ মেলাতে পারি, গ্রাফ আঁকতে পারি কিংবা পরিমাপ করতে পারি। প্রকৃতি যেন আমাদের সঙ্গে গণিতের ভাষায় কথা বলে। আমরা কেন মহাবিশ্বকে বুঝতে পারি, এটাই বড় রহস্য। মজার বিষয় হলো, আমরা যত বেশি বুঝতে পারি, তত বেশি নতুন প্রশ্ন আমাদের সামনে হাজির হয়। কৌতূহলের এই যে অবিরাম ধারা, এটা কখনো শেষ হয় না। সেখান থেকেই তো আমরা নতুন সব জ্ঞান অর্জন করছি।
এলিয়েন বা বহির্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? আমরা কি এই মহাবিশ্বে একা?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: এলিয়েন নিয়ে আমি একদমই আশাবাদী নই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ভিনগ্রহের প্রাণী বলে কিছু নেই। মহাকাশে যেসব অদ্ভুত উড়ন্ত চাকি বা বস্তুকে আমরা ইউএফও বলি, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই ইউএফওগুলো কেন জানি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বেশি দেখা যায়। আমার ধারণা, এগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন সামরিক পরীক্ষা, যেগুলোকে তারা ইউএফও বলে চালিয়ে দেয়। এগুলো আসলে বিশেষ কিছু নয়।
গাণিতিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের এই মিল্কিওয়েতে যদি যোগাযোগ করার মতো কোনো বুদ্ধিমান সত্তা থেকেও থাকে, তবে সেই সংখ্যা এক থেকে চারের বেশি হবে না; অর্থাৎ প্রায় নেই বললেই চলে। হয়তো প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডাতে বা আরও দূরের কোনো গ্যালাক্সিতে একটি বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব এত বেশি যে সেই পথ পাড়ি দিয়ে এলিয়েনের পৃথিবীতে আসা প্রায় অসম্ভব।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী মার্টিন রিস একবার বলেছিলেন, কখনো যদি এলিয়েন দেখো, তবে নিশ্চিত থেকো সেটা কোনো জৈবিক সত্তা নয়; বরং হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কোনো প্রাণের পক্ষে এত বিশাল মহাজাগতিক দূরত্ব পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। তারা হয়তো এআই–সমৃদ্ধ কোনো যান পাঠাবে। সেই এআই দেখে আমরা হয়তো বুঝতে পারব, এর পেছনে কোনো বায়োলজিক্যাল অরিজিনেটর আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা এমন কিছুর দেখা পাইনি।
আমার মনে হয়, পুরো বিষয়টি মহাবিশ্বের বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার এক বা দুই বিলিয়ন বছরের মধ্যেই যে প্রাণের বুদ্ধিমত্তা তৈরি হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। পৃথিবীর ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, প্রাণের এই বর্তমান ম্যাচিউরিটি অর্জন করতে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর লেগে গেছে। হয়তো আগামী দুই বিলিয়ন বছরের মধ্যে মহাবিশ্বের অন্য কোথাও দু-একটা বুদ্ধিমান প্রাণের দেখা পাওয়া যেতেও পারে। তখন হয়তো মানবজাতি এখানে আর থাকবে না, এটা নিশ্চিত। তবে এই বিষয়ে কৌতূহল নিবারণ করতে আমার ‘এলিয়েনের সন্ধানে’ বইটা পড়তে হবে।
কারও সঙ্গে নয়, প্রতিযোগিতা করো প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে—মিজানুর রহমানমানুষ হয়তো আবার এক বা দুই বছরের মধ্যেই চাঁদে যাবে। তারপর মঙ্গলে যাওয়া নিয়ে কথা শুনছি। মঙ্গলে বসতি স্থাপন করা কি সম্ভব?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: হ্যাঁ হ্যাঁ, এগুলো অসম্ভব নয়। তবে আমাদের সভ্যতার যে পরিস্থিতি, এগুলো ধারাবাহিকভাবে হতেই থাকবে। আমরা আরও আগেই কেন মঙ্গলে গেলাম না, সেটাই এখন প্রশ্ন। এখন আমাদের নিজস্ব গ্রহের যা অবস্থা, সেখানে এত মারামারি; আমার খুব ভয় হয় যে মানবসভ্যতা খুব বেশি দিন বাঁচবে না। স্টিফেন হকিংও এটা বলে গেছেন। আমরা ভেবেছিলাম, শান্তিশৃঙ্খলায় একটি বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ হবে। কিন্তু হচ্ছে তো সম্পূর্ণ উল্টোটা। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আক্রমণ করছে। এটা কোনো সভ্য সমাজে হয়? আমরা জীবিত অবস্থায় চোখের সামনে গণহত্যা দেখছি গাজায়। আমরা সেখানে একটি কথাও বলতে পারি না!
এখনকার জেনারেশন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে কি ভবিষ্যতে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে বলে মনে করেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: অনেকেই এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী দিচ্ছেন, তবে মানুষের সংখ্যাও তো কম নয়। তখন তারা কী করবে। তাদের কিছু না কিছু তো করতে হবে। বর্তমানে প্রতিটি খাতেই এআই নিয়ে এ ধরনের নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে মানুষ তার নিজের জায়গাটি এত সহজে ছেড়ে দিতে চাইবে না। ফলে যাঁরা এআই নিয়ে ব্যবসা করবেন, তাঁদের ওপর একটি সামাজিক চাপ সব সময়ই থাকবে, যাতে মানুষের কর্মসংস্থান বা গুরুত্ব বজায় রেখেই তাঁরা এগিয়ে যান। সোশ্যাল মিডিয়ার কথাই ধরুন; সেখানে যদি মানুষের কোনো অংশগ্রহণ না থাকে, তবে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেই জগৎ কখনোই জমবে না। আমার মনে হয়, সবকিছুর ভিড়ে মানুষের একটি নিজস্ব স্থান সব সময়ই অক্ষুণ্ন থাকবে।
এআই একটি নতুন প্রযুক্তি। আমাদের দেখতে হবে, এটি আরও কত দূর পর্যন্ত যায়। অনেক কাজে এটি আমাদের সাহায্য করবে বলে মনে হচ্ছে। তবে প্রযুক্তিটিকে আরও সময় দিতে হবে, এটি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে আসুক; সময়ই বলে দেবে এর ব্যাপ্তি আসলে কতখানি হবে। সোশ্যাল মিডিয়া যখন প্রথম এসেছিল, আমরা তখন এর গুরুত্ব মোটেও বুঝতে পারিনি। কিন্তু এআইয়ের শুরুর গতিটাই অভাবনীয়। এটি কত দূর যাবে, তা বুঝতে আমাদের আরও কিছুটা সময় লাগবে। আসলে এই প্রযুক্তির স্রষ্টা যেহেতু মানুষই, তাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানুষই প্রভাবিত করবে।
এগিয়ে থাকার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি মানবিক থাকা—বি এম মইনুল হোসেনলেখালেখি ও গবেষণার অবসরে কী করেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমার অবসর ওই বই পড়া। আমার বাচ্চাটার সঙ্গে সময় কাটানো, তাকে পড়তে সাহায্য করা। আমার শখই বই পড়া ও ভালো মুভি দেখা। থ্রিলার ঘরানার মুভি ভালো, বেশি চিন্তা করতে হয় না; দুই ঘণ্টার মধ্যে ভালো বিনোদন পাওয়া যায়।
আপনার আরেকটা পরিচয় হলো আপনি বইয়ের পোকা। হাঁটতে হাঁটতে, খেতে খেতে কিংবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও আপনি বই পড়েন। সব সময় সঙ্গে একটা বই রাখেন। সুযোগ পেলেই সেটা পড়তে শুরু করেন। আপনার বই পড়ার এ ধরনের অভ্যাস কীভাবে গড়ে উঠল?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমার বই পড়ার অভ্যাসটা মূলত গড়ে ওঠে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। এর পেছনে একটি বিশেষ পরিস্থিতির ভূমিকা ছিল। আমরা যখন ধানমন্ডির জিগাতলায় থাকতাম, তখন বন্ধুদের সঙ্গে অনেক খেলাধুলা করতাম। কিন্তু যখন মনিপুরে চলে এলাম এবং আমি মনিপুর হাইস্কুলে ভর্তি হলাম, তখন এটা কমে যায়।
তখন আমি হকিস্টিক দিয়ে খেলতাম। কিন্তু এলাকার কিছু বড় ভাই আমাকে পরামর্শ দিলেন, হকিস্টিক নিয়ে খেলাটা আমার জন্য নিরাপদ হবে না। কারণ, সে সময় হকি খেলার স্টিককে অনেকে মারামারির অস্ত্র হিসেবে দেখত। যেহেতু আমার প্রিয় খেলাটাই এভাবে বন্ধ হয়ে গেল, আমি নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিলাম। আর সেই একাকিত্ব কাটাতে ধীরে ধীরে বইয়ের দিকে ঝুঁকলাম। তখন থেকে আমার কাছে বই এক গভীর নেশার মতো হয়ে গেছে। বই পড়ার সঙ্গে আছে বই সংগ্রহ করার নেশাও।
শুরুর দিকে ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত আমাকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল। এমনকি আমার প্রতিটা খাতার ওপরে রুবাইয়াত-এর চার লাইন করে লেখা থাকত। এ ছাড়া কার্ল সেগানের কসমস বা ব্রোকাস ব্রেন, এই বইগুলো পড়ে মনে হয়েছে ভালো। বই পড়ার এত অভ্যাস আমাকে সম্মানিত করেছে। বই মানুষকে আলোকিত করে।
ভুয়া কল ভেবে কেটে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম—চিকিৎসায় নোবেলজয়ী মেরি ব্রুনকোএমন কোনো বইয়ের নাম বলবেন, যা সবার পড়া উচিত?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমার মতে, কার্ল সেগানের কসমস বইটা সবার পড়া উচিত। এ ছাড়া স্টিফেন হকিংয়ের আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম, রজার পেনরোজের দ্য এম্পেররস নিউ মাইন্ড, টোবিয়াস ড্যানজিগের নাম্বারস, সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ের দ্য জিন ও দ্য সং অব দ্য সেল, স্টিভেন রোজের দ্য কেমিস্ট্রি অব লাইফ বইগুলো পড়া উচিত।
এখন বাংলাদেশের মানুষ বই পড়া কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমাদের গভীরভাবে বুঝতে হবে, কেন আমরা বই থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছি। বর্তমান সময়ে মানুষ ডিভাইসের প্রতি এতই আসক্ত যে এটি তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে সারাক্ষণ উদ্দীপিত রাখে এবং একধরনের নেশার মতো আটকে ফেলে। আমাদের মস্তিষ্ক মূলত যেকোনো ধরনের নড়াচড়া বা মুভমেন্ট খুব দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। আর ঠিক এ কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস বা ছোট ভিডিওগুলোর প্রতি মানুষের এত প্রবল আগ্রহ।
এ আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে ডিভাইস থেকে নিজেকে কিছুটা সময় সরিয়ে রাখা জরুরি। আমার পরামর্শ হলো, দিনের অন্তত দুই ঘণ্টা এমন একটি ঘরে থাকা উচিত, যেখানে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস থাকবে না। যখন আপনার হাতে কোনো ফোন বা কম্পিউটার থাকবে না, তখন আপনি অনেকটা বাধ্য হয়েই বই পড়বেন অথবা অন্য কোনো সৃজনশীল চিন্তা করবেন। এমনকি অনেক ইউরোপীয় দেশে এখন ১৫ বছরের আগে ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এভাবে পড়ার অভ্যাস বাড়তে পারে।
একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা বই পড়ার অভ্যাস গড়তে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার নিজস্ব একটা আলো ও স্নিগ্ধতা আছে। আমরা যদি সঠিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারি, তবে মানুষ এমনিতেই বইয়ের দিকে ঝুঁকবে। কারণ, প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে অজানাকে জানার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো বিষয় নিজে না পড়লে তা কখনোই আত্মগত হয় না। ভিডিও ব্লগ বা ছবি দেখলে হয়তো সাময়িকভাবে ভালো লাগে, কিন্তু সেই তথ্য মস্তিষ্কে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। মানুষ তা দ্রুত ভুলে যায়। কোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে এবং সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়াতে পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের সমাজে একটি সুষম পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা যখন সমাজের সব স্তরে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে, তখনই বই পড়ার এই সংস্কৃতি টেকসই হবে। দীর্ঘ মেয়াদে বই থেকে দূরে থাকার অর্থ সমাজে অস্থিরতা, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার বেড়ে যাওয়া। এতে আমাদের সভ্যতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
‘বিরল গোলাপি হাতির দল রক্ষায় আমাদের অক্ষমতা যেন জয়ী না হয়’— এম এ আজিজবাংলাদেশে বিজ্ঞানবিষয়ক বই গত ১০ বছরে অনেক বেড়েছে। একঝাঁক তরুণ লেখক এখন বই লিখছেন, অনুবাদ করছেন। ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছেন? বইগুলো কি মানসম্পন্ন হচ্ছে?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: খুব ভালো লক্ষণ। আমি একসময় ক্ল্যাসিক বিজ্ঞানের বইগুলোর অনুবাদের কথা অনেক বলেছিলাম। কেউ শুনত না। অনুবাদ করতে আসত না। আপনি শুরু করেছেন। অনেকগুলো ভালোভাবে অনুবাদ করেছেন। আপনি তো স্টিফেন হকিংয়ের সব কটি বই অনুবাদ করেছেন। আপনাকে অভিবাদন। এটা একটা ভালো কাজ করেছেন। এ ছাড়া আপনি আরও অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু আমি বলব, ক্ল্যাসিক বইগুলা আরও অনুবাদ করা দরকার। এগুলো একটা সেট ধরে করতে হবে। ব্যবসায়িক দিক থেকে হয়তো সব ভালো চালবে না, কিন্তু সেটের একটা চললেই তো হলো! বইয়ের ব্যবসায় দেখতে হবে, আমার যদি ৪০টা বই থাকে, এর মধ্যে যদি ২–৩টা বই সেল হয়, ওই টাকা দিয়ে বাকিগুলা চালাতে হবে। এভাবে এটা না করলে হবে না। ৪০টা বইয়ের মধ্যে ৩০টাই চলে না।
তরুণ লেখকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমি লক্ষ করছি, বর্তমানে আমাদের তরুণ লেখকদের মধ্যে একটি বিশেষ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাঁরা প্রায় সবাই ব্ল্যাকহোল, এক্সোপ্লানেট বা মহাকাশ নিয়ে লিখতে চান। আমার পরামর্শ হলো, আপনাদের এখন মহাকাশের সীমানা পেরিয়ে বাইরে আসতে হবে। আমরা বর্তমানে জীববিজ্ঞান বা রসায়নের ভালো লেখক খুব একটা পাচ্ছি না। অথচ রাসায়নিক বিক্রিয়া বা জীববিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোকে সহজ করে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা এখন ভীষণ প্রয়োজন।
পরিভাষার সুসামঞ্জস্যতা বজায় রাখা খুব জরুরি। একেকজন লেখক যদি একই বিষয়ের জন্য একেক রকম পরিভাষা ব্যবহার করেন, তবে পাঠকদের জন্য তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আমার প্রস্তাব হলো বাংলা একাডেমি ও দেশের বিজ্ঞান লেখকেরা মিলে একটি মানসম্মত পরিভাষা তৈরি করা, যাতে সবাই তা অনুসরণ করতে পারে। এতে বিজ্ঞানের ভাষা সবার কাছে একই রকম মনে হবে। ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ ম্যাগাজিনের খুব জোরালো ভূমিকা এখানে আছে।
অনুবাদের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদের চেয়ে ভাবানুবাদ বা পাঠযোগ্যতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বিষয়কে অত্যন্ত ভারী বা কঠিন শব্দ দিয়ে ভারাক্রান্ত না করে সহজবোধ্য করে লিখতে হবে, যেন পাঠক সেটি সহজে নিজের ভেতর ধারণ করতে পারে। যাঁরা অনুবাদে আগ্রহী, তাঁরা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ল্যান্ডমার্ক সিরিজ থেকে চর্চা শুরু করতে পারেন।
বিজ্ঞান কোনো গুরুগম্ভীর বা ভীতিকর বিষয় নয়। একে সহজ ও আনন্দের সাথে পাঠকের সামনে পরিবেশন করতে হবে।
ভালো বিজ্ঞানীই শুধু ভালো পৃথিবী গড়তে পারে— মো. আনোয়ারুল ইসলাম, গবেষকআপনার মতে সেরা বিজ্ঞানী কে? নিউটন নাকি আইনস্টাইন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: অবশ্যই আইনস্টাইন। কারণ, তিনি অনেক প্যারাডাইম শিফট ঘটিয়েছেন। তাঁর পাঁচটা পেপারের কথা যদি ধরি, সেখানে কয়েকটা প্যারাডাইম শিফট হয়েছে। অন্তত দুটি কোয়ান্টামে এবং একটা রিলেটিভিটিতে। নিউটনের মেধা ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের মাধ্যমে আমাদের এলোমেলো চিন্তাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো বা রূপ দেওয়ার কাজ করেছেন। কিন্তু আমাদের চিন্তাকে সীমানার বাইরে প্রসারিত ও ব্যক্ত করার কাজটা করেছেন মূলত আইনস্টাইন। নিউটন আসলে অন্য সব মহাজ্ঞানীর কাজের ওপর ভিত্তি করেই তাঁর কাজটা করছিলেন। তাঁর কাজের সূচনা হয়েছিল গ্যালিলিওর সময় থেকেই। এরপর ধাপে ধাপে এগোচ্ছিল। অনেকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করছিলেন। যেমন ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন লিবনিজ। নিউটন আসলে সব একসঙ্গে করে সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। তাই আমার কাছে আইনস্টাইনকেই সেরা মনে হয়।
একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। ধরা যাক, নিউটন ও আইনস্টাইন বর্তমানে জন্মালেন। তাহলে তাঁরা কী নিয়ে গবেষণা করতেন?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: এখন থাকলে তাঁরা হয়তো আলাদা বিষয় নিয়ে গবেষণা করতেন না। ওনারা যদি একসঙ্গে কাজে বসতেন, তবে আমার ধারণা, তিন মাস পার হওয়ার আগেই প্রচণ্ড ঝগড়া করে দুজন দুই দিকে চলে যেতেন। আর সেই ঝগড়া শুরু করতেন অবশ্যই নিউটন। তাঁর গ্রুপটাও বড় হতো। তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত ছাত্র আসত এবং বেরিয়েও যেত। স্টিফেন হকিং নিউটন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন ভীষণ জটিল মানুষ।’ উনি বিয়ে করেননি। অত্যন্ত উন্মাদ প্রকৃতির মানুষ। নিউটন আসলেও বেশ খ্যাপাটে ও অদ্ভুত স্বভাবের ছিলেন।
খেয়াল করে দেখবেন, নিউটন অনেক ধরনের কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন, এমনকি আলকেমির চর্চাও করেছিলেন। আইনস্টাইন ফিজিকসের বাইরে অন্য চিন্তা করেছেন বলে শুনিনি, বেহালা বাজানো ছাড়া।
বিজ্ঞানকে অনেকেই খুব সিরিয়াস বা গুরুগম্ভীর বিষয় বলে মনে করেন। যেন বিজ্ঞান নিয়ে কোনো রসিকতা করা উচিত নয়। সেটা কি বিজ্ঞানকে কঠিন বা রসকষহীন মনে করে সর্বস্তরে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠতে পারে?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বিজ্ঞান তো হাস্যরসের বিষয় নয়। এটা খুব সিরিয়াস একটা জিনিস। কারণ, আপনি প্রকৃতিকে পাঠ করছেন। প্রকৃতি নিজেই গম্ভীর। প্রকৃতি হাস্যরস পায় না। তখন সেখানে আপনাকে হাস্যরস ত্যাগ করেই যেতে হবে। কিন্তু এখানে তামাশার সুযোগ তো থাকেই। মানুষ তামাশাপ্রিয়। একেবারে সারাক্ষণ সে একটা দৃঢ় গণিত নিয়ে চিন্তা করতে পারে না। যাঁরা বেশি বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছেন, দেখবেন তাঁরা অনেকে পাগল হয়ে গেছেন। এ জন্যই বলে, ম্যাথমেটিশিয়ান আর নট মেড, তাঁরা জন্মায়ই গণিতবিদ হয়ে। তাঁদের ৪০ বছর বয়সের আগেই কাজ শেষ হয়ে যায়।
বিজ্ঞানের কি কোনো গন্তব্য আছে? থাকলে সেটা কী? আমাদের জ্ঞানচর্চার চূড়ান্ত ফলাফল কী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বিজ্ঞানের চূড়ান্ত ফলাফল বলে কিছু নেই। বিজ্ঞানের কোনো গন্তব্য নেই। বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে পড়া, প্রকৃতিকে পাঠ করা। বাস্তবতা কেমন, সেটা নিয়ে টেস্ট করা, পরীক্ষা করা, পরীক্ষণ করা, যাচাই করা এবং প্রতিনিয়ত এই পাঠ জারি রাখা। এই পাঠ তাকে যেদিকে নিয়ে যাবে, সেটাই তার গন্তব্য।
বাংলাদেশের অনেক বিজ্ঞানী বা গবেষক এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এটা আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। আবার একটা দ্বিমত আছে যে এর ফলে নাকি ব্রেন ড্রেন হচ্ছে। আপনার কী মনে হয়?
অধ্যাপক ও লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আমাদের দেশ থেকে মেধাবীরা যে হারে বাইরে চলে যাচ্ছেন, তাকে নির্দ্বিধায় ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার বলা যায়। আমরা আসলে আমাদের সন্তানদের নিজেদের কাছে রাখতে পারছি না। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভাগের কথাই যদি বলি, গত ১০ বছরে প্রতিবছর গড়ে একজন সহকর্মী হয়তো বিদেশ থেকে ফিরেছেন, কিন্তু এর বিপরীতে অন্তত ২০ জন সহকারী অধ্যাপক বা লেকচারার দেশ ছেড়েছেন। তাঁরা এখন আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোতে ছড়িয়ে আছেন। এমনকি ২০০০ সালের শুরুর দিকে আমার নিজের ক্লাসের ১৭ জন বন্ধু একসঙ্গে ইনটেলে চাকরি করত। এখন তো শয়ে শয়ে বাংলাদেশি মেধাবী চিপ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। বিদেশের ইন্ডাস্ট্রি আমাদের মেধা দিয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের জন্য কী করতে পারলাম?
আমার পিএইচডি সুপারভাইজার একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমরা এত শ্রম দিয়ে তোমাকে তৈরি করছি, কিন্তু তুমি যদি চলেই যাও, তবে আমাদের লাভ কী?’ আজ আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের দেখেও একই কথা ভাবি। আমরা কি শুধুই মেধা রপ্তানি করব? আমাদের এখানে কি কোনো নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন হবে না?
অনেকে মনে করেন, এখানে থাকলে কী উদ্ভাবন হবে? আমি বলি, উদ্ভাবন না হোক, অন্তত আমাদের প্রকৌশলীদের দিয়ে কি আমরা একটি পদ্মা সেতু সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বানাতে পারতাম না? অবশ্যই পারতাম, সেই সক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় অভিজ্ঞতার অভাব। বড় বড় যন্ত্রপাতি বা ভারী প্রকৌশলবিদ্যা আমরা সেভাবে দেশে চর্চা করতে পারি না। আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা ব্যুরোক্রেসি। ব্যুরোক্রেসি যতক্ষণ না বুঝবে, বিজ্ঞান তত দিন প্রস্ফুটিত হবে না।
আমাদের লক্ষ্য মঙ্গলে যাওয়া—সুনিতা উইলিয়ামস, নভোচারী, নাসাযাঁরা এখন দেশের বাইরে কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই ফিরতে চান। কিন্তু সে রকম কোনো প্ল্যাটফর্ম কি আমাদের আছে? সরকার কি এর জন্য কিছু করতে পারে?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: এটি শুধু সরকার একা করলে হবে না; কারণ, আমাদের বেসরকারি খাত বা সামগ্রিক ইকোসিস্টেম সেটাকে সাপোর্ট করে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। যাঁরা বিদেশ থেকে এসে এখানে কাজ করতে চান, তাঁদের বুঝতে হবে যে ভ্যাকেশনের মেজাজে এসে উপদেশ দিয়ে কিংবা শুধু পলিসি করে দিলে কোনো ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়াবে না। আমি নিজে যখন ফিরে আসছি, তখন বিদেশি পাসপোর্টও নিইনি। কারণ, আমি ঠিক করেই এসেছি যে আর বিদেশে যাব না। আমি চেয়েছি এখানেই থাকতে। এ দেশে জন্মেছি, এ দেশেই মৃত্যুবরণ করতে চাই। যাঁরা বাইরে থেকে ফিরবেন, তাঁদেরও এখানে থাকতে হবে, বাস করতে হবে এবং এখানকার সমস্যার সঙ্গে মিশে যেতে হবে। তবেই তাঁরা অর্থবহ ভাষায় কথা বলতে পারবেন। প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়টি একটি যৌথ ব্যাপার, যেখানে অনেক বিষয় জড়িত। তবে আমাদের হয়তো দেশপ্রেমের অভাব আছে।
দেশের টানে মুহম্মদ জাফর ইকবাল, জামাল নজরুল ইসলামসহ আরও অনেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু দেশ কি তাঁদের সেভাবে কিছু ফেরত দিতে পারছে? মানে সেই হতাশা থেকে কি বর্তমানে অনেকে ফিরতে চান না?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: হ্যাঁ, সেই হতাশা আছে। এটা একটা বড় প্রশ্ন। এটা এখন শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, এটা যেকোনো পেশার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা দেখি। মিড–লেভেলে গিয়ে আমাদের কর্মকর্তারা প্রচণ্ড হতাশ হয়ে যান। আর্মিতে হয়, ব্যুরোক্রেসিতে হয়। এই শিক্ষাজগতেও হয়। আমরা যা হতে চাইছিলাম, যে গবেষণা করতে চাইছিলাম, সে ধরনের ফান্ডিং কোথায়? এখানে তো দেয় না, এখানে আসে না। আমরা ছাত্র পাই না, ছাত্র রাখতে পারছি না; কারণ, তাকে আমরা বেতন দিতে পারছি না। সে একা নিজে কী গবেষণা করবে? এতে মানুষ হতাশ হয়ে যায় এবং মিড–লেভেলের হতাশা তরুণ লেভেলের কাছে পৌঁছায়। সে যখন দেখে তার বড় ভাই বা মেজ চাচা বা খালু একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে আটকে গেছেন, তখন সে হতাশ হয়ে যায়। এটাও কিন্তু বড় নেগেটিভ মেসেজ। রাজা বদলাবে রাজা আসবে, নলখাগড়া বা উলুখাগড়ার কেন প্রাণ যাবে?
তাকে তার মতো জায়গায় থাকতে দিতে হবে, তার কাজটি করতে দিতে হবে। কারণ, রাজার আদেশেই সব কাজ হয়। এখন সেই জায়গাগুলোয় সেই সুবিধা যদি না থাকে, তাহলে সে আসবে না। সে এসে একটা বিপদে পড়বে। সে একটা সরকারকে পরামর্শ দিল, পরে সরকার এসে তাকে যদি কারাবন্দী করে, এটা তো অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ফরাসি বিপ্লবে প্রতিশ্রুতিশীল রসায়নবিদ ল্যাভয়েসিয়েঁ প্রাণ হারান, কিন্তু লাপ্লাস ঠিকই বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু এমন সুযোগসন্ধান সবার পক্ষে কি সম্ভব হয়?
ধানবিজ্ঞানীদের গবেষণার কাজে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার—নূর মোহাম্মদ, কৃষকবিজ্ঞানীবিজ্ঞানী মানেই ‘মহান’। প্রায় সব বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রেই আমরা এই শব্দ ব্যবহার করি। এটি কি অতিশয়োক্তি দোষে দুষ্ট নয়?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বিজ্ঞানীদের আসলে মহান বলা উচিত নাকি মেধাবী, নাকি প্রতিভাবান? প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বলা যায়। কিন্তু যাঁরা বয়স্ক বিজ্ঞানী, তাঁদের প্রতিভাবান বললে মূল্যায়নটা ঠিক হয় না। তিনি তো প্রতিভা দেখিয়েই এখানে এসেছেন। ‘মহান বিজ্ঞানী’ শব্দটা প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিজ্ঞান বইগুলোতে অনেক ছিল। কিন্তু আমার কাছে এখন মনে হয়, বিজ্ঞানীদের হাতে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা যায়নি, এটা আল্লাহর রহমত। গেলে যে কী হতো, আমরা তা বিভিন্ন দেশে দেখেছি। বাংলাদেশেও দেখছেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব খুব বেশি শিক্ষিতদের হাতে দিতে নেই। এটা পরিষ্কার। রাজনৈতিক সিস্টেমে মোটামুটি মধ্য শিক্ষিতই যথেষ্ট। বিজ্ঞানীরা তো ভিড়ের মধ্যে কাজ করেন না। ভিড় নিয়ে তাঁরা কখনো কাজ করেননি। তাঁরা নিঃসঙ্গ যাত্রী। কারণ, গবেষণাই তাঁদের নিঃসঙ্গ তরণি। লেখার সময় কি আপনি বাজারে বসে লিখতে পারবেন? পারবেন না। রাজনীতিবিদেরাই কিন্তু ভিড় বোঝেন। তাঁরা জানেন, ভিড় কীভাবে সামলাতে হয়। এ জন্য ওখানে রাজনৈতিক দক্ষতা লাগে। অন্য কোনো দক্ষতা হলে চলবে না। এটা আমাদের ল্যাকিং আছে, স্বীকার করতেই হবে।
আমাদের কিশোর ও তরুণ পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন। যারা বিজ্ঞান ভালোবাসে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: বই পড়ো। বিজ্ঞানের বইগুলো পড়ো, বোঝার চেষ্টা করো। যারা বিজ্ঞানী হতে চায়, তাদের অবশ্যই বিজ্ঞানের বইগুলো পড়তে হবে। প্রথাগত শিক্ষার দিকে যেতে হবে। মানে কোনো একটা ডিসিপ্লিনে তাকে ভর্তি হতে হবে। ফ্রি লার্নিং এখানে হবে না। যার যে বিষয় ভালো লাগে, সে সেই বিষয়ে পড়বে। তবে অবশ্যই সিলেবাস অনুযায়ী। তাকে গবেষণা করতে হবে। ওখান থেকেই সবকিছু শিখে ফেলবে। বড় বিজ্ঞানীদের বইগুলো পড়লে শিক্ষার্থীরা গবেষণার মজা পাবে।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী: আপনাকেও ধন্যবাদ।