বোস, আইনস্টাইন ও কোয়ান্টাম স্পিনের জন্মকথা

· Prothom Alo

১৯০০ সালে কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম দেন জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। প্ল্যাঙ্ক চেয়েছিলেন পরিসংখ্যানের সাহায্যে আলোক বিকিরণের সমস্যার সমাধান। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশক পদার্থবিজ্ঞানীদের ভুগিয়েছে কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ। পদার্থবিজ্ঞানে তখন আলোর বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তত্ত্ব ছড়ি ঘোরাচ্ছে। এর ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে বিদ্যুৎ–গতিবিদ্যা। সাধারণ আলো কিংবা বিকিরণের সব ধর্ম ও চরিত্র ব্যাখ্যা করা যায় বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গের সাহায্যে। কিন্তু কৃষ্ণবস্তু, যা নাকি শতভাগ আলো ও তাপ শোষণ করে নেয়, এমন বস্তু থেকে বিকীর্ণ আলোর রকমসকম অদ্ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল সেকালের বিজ্ঞানীদের। বেগুনি বিপর্যয় নামে একটি বড় সমস্যা বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। বেগুনি বিপর্যয় কী, সেটা নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তার জুলাই ২০২১ সংখ্যায় বিস্তারিত একটা লেখা প্রকাশ করা হয়েছিল। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।

Visit goldparty.lat for more information.

কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যাখ্যা করার জন্য তখন দুটি তত্ত্ব ছিল। একটি দিয়েছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেম ভিন, অন্যটি ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের। এই তত্ত্বের একটি দিয়ে দীর্ঘ তরঙ্গের বিকিরণের ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা যেত, অন্যটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেত ক্ষুদ্র তরঙ্গের বিকিরণের ব্যাখ্যা। কিন্তু একই সঙ্গে দুই ধরনের তরঙ্গের ব্যাখ্যা পাওয়া যেত না কোনো সূত্র দিয়েই। তখন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রকাশ করলেন তাঁর কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এই তত্ত্বে আলোকে বিচ্ছিন্ন ধারার শক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা না করে, বিচ্ছিন্ন শক্তির প্যাকেট হিসেবে বর্ণনা করলেন। আইনস্টাইন শক্তির প্যাকেটের নাম দিয়েছিলেন কোয়ান্টা, প্রায় ২৬ বছর পর সেটারই নামকরণ করা হয় ফোটন কণা। আইনস্টাইন আলোক তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ব্যবহার করেন প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এর ফলে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা দুই–ই পায় তত্ত্বটি।

কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যাখ্যা করার জন্য তখন দুটি তত্ত্ব ছিল। একটি দিয়েছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেম ভিন, অন্যটি ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের।

প্ল্যাঙ্ক সমীকরণের ডান দিকে দুটি অংশ। প্রথম অংশটি আলোকে কণা হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় অংশটা বেশ গোলমেলে। যে বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গের হাত থেকে বাঁচার জন্য জন্ম হয়েছিল প্ল্যাঙ্ক সমীকরণের, সেই তরঙ্গ তত্ত্বই রয়ে যায় খোদ প্ল্যাঙ্ক সমীকরণে। সমস্যাটার গভীরতা বুঝতে পেরেছিলেন আইনস্টাইন, এমনকি প্ল্যাঙ্কও এটা নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতেন, কিন্তু সমাধানটা ছিল তাঁদের দুজনের কারও কাছে। আইনস্টাইন ১৯১৭ সালে একটি সমাধান দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটা জুতসই হয়নি। তাই আইনস্টানের আর সব তত্ত্বের মতো এটি অতটা হইচই ফেলতে পারেনি। সমস্যাটা বুঝেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের রিডার সত্যেন বোস। আর সেটা নিয়ে ভাবতে থাকেন। একসময় সমাধান পেয়েও গেলেন সত্যেন বোস। প্ল্যাঙ্ক সমীকরণকে ত্রুটিমুক্ত করে নতুনভাবে লিখলেন বোস। নতুন এই সমীকরণে আলোর বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় অংশটা আর রইল না। খাঁটি কণাতত্ত্ব দিয়ে সেটাকে নতুনভাবে গড়ে তুললেন। তারপর সেটা পাঠালেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফিলোসফিক্যাল জার্নালে। এই জার্নালে এর আগে সত্যেন বোসের একাধিক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে।

তাই হয়তো আত্মবিশ্বাসী ছিলেন সত্যেন বোস। কিন্তু জার্নালের সম্পাদক বোধ হয় ভারতবর্ষের তরুণ গবেষককে নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। কে জানে, হয়তো ৩০ বছর বয়সী এক বাঙালি তরুণের এই বৈপ্লবিক কাজকে ধৃষ্টতা ভেবেছিলেন কি না। সম্পাদক মশাই প্রবন্ধটা না ছেপে ফেরত পাঠিয়ে দেন। কিন্তু জহুরি জহর চেনে। আইনস্টাইনের কাছে যখন পৌঁছাল, তখন সেটাকে লুফে নিলেন তিনি। বুঝতে পারলেন সত্যেন বোসের কাজটার গুরুত্ব। তাই বোসের অনুরোধ মোতাবেক নিজ হাতে সেটা অনুবাদ করে পাঠালেন সাইটস্রিফট ফ্যুর ফিজিক–এ। সেই জার্নালে ছাপা হলো সত্যেন বোসের জার্নাল। এর মাধ্যমে ত্রুটিমুক্ত হলো প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কণা পদার্থবিজ্ঞান এক ধাপ এগিয়ে গেল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দিকে।

আইনস্টাইন ১৯১৭ সালে একটি সমাধান দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটা জুতসই হয়নি। তাই আইনস্টানের আর সব তত্ত্বের মতো এটি অতটা হইচই ফেলতে পারেনি।

প্ল্যাঙ্কের সূত্রের পরীক্ষামূলক প্রমাণ কিন্তু আইনস্টাইন দেননি। আসলে আইনস্টাইন এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিসিস্ট ছিলেন না। তিনি বরং প্ল্যাঙ্কের তত্ত্ব ব্যবহার করে আলোক তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এরই ফলে অন্য কোনো গবেষণায় প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছিল কোয়ান্টাম তত্ত্ব।

১৯১০ সালে ডাচ-মার্কিন বিজ্ঞানী পিটার ডিবাই প্ল্যাঙ্ক তত্ত্বের ব্যাখ্যা দেন। এটাও ছিল তাত্ত্বিক প্রমাণ। ব্যবহারিক নয়, কিন্তু সরাসরি গাণিতিক ব্যাখ্যা ছিল, ছিল প্ল্যাঙ্ক তত্ত্বের তাৎপর্যও। ডিবাইয়ের ব্যাখ্যাটি ছিল পরিসংখ্যান ও বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তত্ত্বনির্ভর। সবচেয়ে বড় কথা, বহু বছর আগে বাতিল হওয়া ইথার তত্ত্বের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল এই তত্ত্বে। অর্থাৎ আলোর কণাবাদী তত্ত্ব পূর্ণরূপ পেল না ডিবাইয়ের ব্যাখ্যাতেও।

১৯১৩ সালে নীলস বোর হাত বাড়ালেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের দিকে। তবে সেটা আলোর চরিত্র ও ধর্ম ব্যাখ্যার জন্য নয়। বরং পরমাণুতে থাকা ইলেকট্রনের আচরণ ও বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করলেন তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের দিকে। অর্থাৎ ভরযুক্ত বস্তু কণাদের জন্যও কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করা হলো। এতে রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দূর করা গিয়েছিল। বোরের এই কাজ কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্য সম্ভাবনাময় জগতের দুয়ার খুলে দেয়। আর সেটিকেই কাজে লাগিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি ১৯১৭ সালে প্ল্যাঙ্ক তত্ত্বের সবচেয়ে সহজবোধ্য ব্যাখ্যাটি হাজির করলেন। অবশ্য আইনস্টাইন বস্তুকণার জন্য প্ল্যাঙ্ক তত্ত্বের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি ব্যবহার করেছিলেন ম্যাক্সওয়েলস বোলজম্যানের সেই পুরোনো পরিসংখ্যান। মোটকথা, বস্তুকণার জন্য বোর যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করেছিলেন, সেটাকেই কাঠামোবদ্ধ করলেন আইনস্টাইন।

কণা কোয়ান্টাম প্রতিষ্ঠায় আইনস্টানের ভূমিকা অনেক বড়। কিন্তু তিনিও ত্রুটিমুক্ত হতে পারেননি। অর্থাৎ প্ল্যাঙ্ক সমীকরণে যে বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গের অংশটা ছিল, সেটা মেনে নিয়েই আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ সমাধান আসতে অপেক্ষা করতে হলো বছর সাতেক। ১৯২৪ সালে সত্যেন বোস সেই কাজই করলেন। প্ল্যাঙ্ক তত্ত্বের মূল ধরে টান দিলেন। বদলে দিলেন খোদ প্ল্যাঙ্কের সমীকরণটিকেই। আর এ জন্য তিনিও আশ্রয় নিলেন পরিসংখ্যানের।

১৯১৩ সালে নীলস বোর হাত বাড়ালেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের দিকে। তবে সেটা আলোর চরিত্র ও ধর্ম ব্যাখ্যার জন্য নয়।

দুই

সত্যেন বোস যে আইনস্টাইনকে একটি চিঠি আর প্রবন্ধ পাঠিয়েছিলেন, সেটা আমরা সবাই জানি। সেটাই আজ বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান নামে পরিচিত বিশ্বব্যাপী। অর্থাৎ বোসের কাজ, সেটা প্রকাশ হওয়া এবং তাঁর খ্যাতির পেছনে আইনস্টাইনের অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কোয়ান্টামবিষয়ক গবেষণা থেকে পরে যে সত্যেন বোস সরে পড়েছিলেন, তার পেছনে আইনস্টাইনের দায় দেখেন অনেকে। কেউ কেউ মনে করেন, সত্যেন বোসের গুরুভক্তি ছিল অতিমাত্রায়, তাই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অদ্ভুত আইনের প্রতি আইনস্টাইন বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন, তারই প্রভাব পড়েছিল সত্যেন বোসের মনে। আরেক দলের আবার অন্য রকম মনোভাব। কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় যে স্পিন ধর্মের প্রচলন রয়েছে, এর আদিগুরু হতে পারতেন সত্যেন বোস।

স্রেফ আইনস্টাইনের বিরোধিতার কারণে সত্যেন বোসের সেই তত্ত্ব আলোর মুখ দেখেনি। এই জল্পনাকল্পনার কারণ হলো, সত্যেন বোসের দ্বিতীয় প্রবন্ধ। সেটিও তিনি পাঠিয়েছিলেন আইনস্টাইনকে। আইনস্টাইনের সুপারিশে সেটি ছাপাও হয়েছিল। কিন্তু আইনস্টাইন প্রথম প্রবন্ধের মতো একটা ফুটনোট জুড়ে দিয়েছিলেন। ‌আইনস্টাইনের ফুটনোট যেমন বোসের প্রথম প্রবন্ধটির মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল কয়েক গুণ, দ্বিতীয় প্রবন্ধের ফুটনোট সেটা করেনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও সত্যেন বোসের সাবেক ছাত্র পার্থ ঘোষের ভাষায়, ‘এই একটি ফুটনোটই হত্যা করেছিল প্রবন্ধটিকে।’

ঘটনাটা ১৯২৪ সালের। ১৫ জুলাই, সত্যেন বোস দ্বিতীয় প্রবন্ধটি পাঠান। এবারও একই অনুরোধ ছিল আইনস্টাইনের কাছে। জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে যেন সাইটস্রিফট ফ্যুর ফিজিক-এ প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। আইনস্টাইন এটাও অনুবাদ করেন এবং সেটা প্রকাশিত হয়। তবে আইনস্টাইনের ফুটনোটসহ। ফুটনোটটিতে আইনস্টাইন লেখেন, বোসের এই মত ঠিক নয়। সুতরাং যখন প্রকাশিত হয় প্রবন্ধটি, বিজ্ঞানীমহলে সেটা কোনো আগ্রহই তৈরি করতে পারেনি।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও সত্যেন বোসের সাবেক ছাত্র পার্থ ঘোষের ভাষায়, ‘এই একটি ফুটনোটই হত্যা করেছিল প্রবন্ধটিকে।’

কী ছিল বোসের দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে। আইনস্টাইন সেটাকে কাটতেই–বা গেলেন কেন?

বসু আলোর কণাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটা ২ গুণ করেছিলেন মূল রাশির সঙ্গে। এই ২ নিয়ে আইনস্টাইনের আপত্তি ছিল। তাই তিনি ধারণাটা ভুল বলে মনে করেছিলেন।

এই ২-এর মাহাত্ম্য কী ছিল? বলা ভালো, ঝামেলাটাই–বা কী ছিল? আইনস্টাইন সেটা মানতেই–বা পারলেন না কেন?

আলোর পোলারাইজেশন বলে একটা ধর্ম আছে, যা আলোকরশ্মিকে দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করে দেয়। এই পোলারাইজেশনের ধারণা আগেও ছিল। অর্থাৎ ক্ল্যাসিক্যাল থিওরিতেও আলোর পোলারাইজেশন ছিল। পোলারাইজেশনটা কী, ব্যাখ্যা করা যাক। আলো বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ। অর্থাৎ আলোর একটা তরঙ্গের মধ্যে আসলে দুটি তরঙ্গ লুকিয়ে আছে। বিদ্যুৎ আর চুম্বক তরঙ্গ। এরা আবার একে অপরের সঙ্গে লম্বভাবে থাকে। অর্থাৎ ‍বিদ্যুৎ তরঙ্গ যে তলে কাঁপে, চুম্বক তরঙ্গ কাঁপে তার লম্ব বরাবর। দুটি আলাদা তলে এই দুই তরঙ্গে কম্পনের অবস্থান। একটা উৎস থেকে আলোক তরঙ্গ নির্গত হয়, সেই আলোর ভেতর প্রচুর তরঙ্গ থাকে। এই তরঙ্গের একেকটি একেক তলে কাঁপে। ত্রিমাত্রিক জগতে সমতল তিনটি। xy, yz ও zx। সাধারণ আলো নিয়ে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, তিনটি তলেই আলোক তরঙ্গ কাঁপছে। এগুলো হলো নন–পোলারাইজড আলো। কোনো একটি বিশেষ পদ্ধতি আলোর সব তরঙ্গকে একমুখী করে ফেলা যায়, তাহলে তখন আলো একটিমাত্র তলে কাঁপবে। সেই আলোকে পোলারাইজড আলো বলা যায়।

ধরা যাক, একটা খোঁয়াড়ে ১০০টি ভেড়া আছে। খোঁয়াড়টির চারদিকে দরজা চারটি। একসঙ্গে যদি সব কটি দরজা খুলে দেওয়া যায়, দেখা যাবে প্রতিটি দরজা দিয়েই কিছু না কিছু ভেড়া বেরিয়ে পড়ছে। কোনটি কোন দরজা দিয়ে বেরোবে, তা আগে থেকে বলে দেওয়া মুশকিল। তাই বেরোনোর সময় ভেড়াগুলোর হাবভাব কেমন ছিল বলা মুশকিল। কিন্তু সব কটি দরজা একসঙ্গে না খুলে একটিমাত্র দরজা দিয়ে ভেড়াগুলোকে বেরোতে দেওয়া হয়, তাহলে সব কটি সুশৃঙ্খলভাবে বের হবে। তাদের হাবভাবও অনেকটা শান্ত থাকবে।

আলো বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ। অর্থাৎ আলোর একটা তরঙ্গের মধ্যে আসলে দুটি তরঙ্গ লুকিয়ে আছে। বিদ্যুৎ আর চুম্বক তরঙ্গ। এরা আবার একে অপরের সঙ্গে লম্বভাবে থাকে।

আলোর ব্যাপারটাও এমন। কোনো এক বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করে আলো সব কটি কম্পনকে একমুখী এবং একই তলে করা যায়, এটাই হলো আলোর পোলারাইজেশন। কিন্তু পোলারাইজেশনের ধারণা আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্বে ছিল না।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব আলোর কণা নিয়ে কথা বলে। তাই কণা বা ফোটনকে পোলারাইজড করা যেতে পারে, এ নিয়ে পূর্ণঙ্গ কোনো ব্যাখ্যা কোয়ান্টাম তত্ত্বে ছিল না। সত্যেন বোস সেই বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। আলোর পোলারাইজেশন ধারণাটাকে প্ল্যাঙ্ক সমীকরণে তিনি নিয়ে এসেছিলেন একটা ২ গুণ করে। যেটার নাম আইনস্টাইন দিয়েছিলেন পোলারাইজেশন ফ্যাক্টর।

সত্যেন বোসের প্রথম ইংরেজি জীবনীকার কামেশ্বর ওয়ালি দাবি করেছেন, আইনস্টাইন সত্যেন বোসকে কিছুটা অবজ্ঞা করেছিলেন, সেটা এই পোলারাইজেশন ফ্যাক্টরের বিষয়ে। অবজ্ঞাটা কী ছিল, সেটা আসলে তিনি জেনেছিলেন সত্যেন বোসের সাবেক ছাত্র পার্থ ঘোষের কাছ থেকে মুব্বাইয়ের এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে। পার্থ ঘোষ কী বলেছিলেন ওয়ালিকে। পার্থ ঘোষের দাবি, সত্যেন বোসের ওই পেপারে আসলে স্পিনের আভাস ছিল, পোলারাইজেশন নয়। কিন্তু আইনস্টাইন সেটা কেটে পোলারাইজেশন লিখে দিয়েছেন।

ভারতীয় বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক পথিক গুহকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পার্থ ঘোষ বলেছিলেন, ‘একদিন সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে গিয়েছি। স্যার আমাকে বললেন, এক গোপন কথা শোনাবেন। কী? আমি উৎসুক। স্যার বন্ধ করলেন দরজা-জানালা। তারপর আমাকে ফিসফিস করে বললেন, “আজ তোকে যা বলছি, তা আর কাউকে বলিস না।” কথা দিলাম যে আমি কাউকে তা বলব না। কিন্তু কী ব্যাপার? স্যারের আবিষ্কৃত সংখ্যায়নে একটা সংখ্যা (৪) এসেছিল। সেটা হবে ৮। কেন হবে, তার ব্যাখ্যাও স্যার দিয়েছিলেন। হবে এ কারণে যে আলোক কণার স্পিন (ঘূর্ণনের মতো একটা ব্যাপার) আছে।

সত্যেন বোসের প্রথম ইংরেজি জীবনীকার কামেশ্বর ওয়ালি দাবি করেছেন, আইনস্টাইন সত্যেন বোসকে কিছুটা অবজ্ঞা করেছিলেন, সেটা এই পোলারাইজেশন ফ্যাক্টরের বিষয়ে।

আলোক কণা ঘুরতে পারে দুইভাবে। এক, আলোককণা যেদিকে ছুটছে, সেদিকেই ঘোরা। দুই, যেদিকে ছুটছে, তার উল্টো দিকে ঘোরা। তাই ৪-এর বদলে ৮ (২×৪)। বসুর বিখ্যাত পেপারটি দেখার পর আইনস্টাইন তা পাল্টে দেন। স্যার আমাকে বললেন, “বুড়ো ওটা কেটে দিল।” পরে আলোক কণার স্পিন পরীক্ষায় ধরা পড়ে। আমি স্যারকে বললাম, “স্পিন ধরা পড়ার পরে কেন আপনি আইনস্টাইনকে বললেন না যে আপনিই ঠিক। তাহলে তো আলোক কণার স্পিনের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য আপনার কৃতিত্ব স্বীকৃত হতো।” স্যার উত্তরে বললেন, “কে বার করেছে, তাতে কী যায়-আসে রে? বেরিয়েছে তো”।’

আইনস্টাইন মহাবিজ্ঞানী তখন। তাঁর কথার ওজন আলাদা। তাই পার্থ ঘোষ যে বলেছিলেন, ফুটনোটটিই সত্যেন বোসের দ্বিতীয় প্রবন্ধটিকে হত্যা করেছিল, এ যুক্তি ফেলে দেওয়া যায় না। পার্থ ঘোষ বলেন, একজন রেফারি যখন একটা প্রবন্ধ রিভিউ করেন, তাঁর মন্তব্য জুড়ে দেন তাতে। সেই মন্তব্য আবার প্রবন্ধের মূল লেখকের কাছে পাঠানো হয়। তিনি যদি রেফারির মন্তব্যের সঙ্গে একমত হন এবং রেফারির নির্দেশমতো কারেকশন করেন, তবেই প্রবন্ধটা ছাপা হয়। নইলে হয় না। কিন্তু সাইটস্রিফ ফ্যুর ফিজিক–এর রেফারি, অর্থাৎ আইনস্টাইনের ফুটনোটটি সত্যেন বোসকে না দেখিয়েই ছেপেছিল। এখানেই আপত্তি পার্থ ঘোষের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আজ কোনো জার্নাল এ রকম ঘটতে দেবে না। পেপার যাঁদের পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়, তাঁদের মন্তব্য এলে সেসব পাঠানো হয় লেখককে। লেখক যদি মন্তব্যের কোনো সদুত্তর দিতে না পারেন, তাহলে সে পেপার ছাপাই হয় না। রেফারিদের ও রকম বিরূপ মন্তব্যসহযোগে কোনো পেপার এখন ছাপার রীতি নেই।’

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, আইনস্টাইন এই পেপারের রেফারি ছিলেন না। ছিলেন সুপারিশকারী। ভুলে গেলে চলবে না, তাঁর একটা ফুটনোটের কারণেই সত্যেন বোসের প্রথম পেপারটি আলোর মুখ দেখেছিল। সুতরাং আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীর মতামতকে রেফারির মধ্যে মন্তব্য হিসেবে দেখেননি জার্নালের সম্পাদকেরা। তা ছাড়া সত্যেন বোসেকে তাঁরা চিনতেন বলেও মনে হয় না; বরং আইনস্টাইনই সেটার প্রেরক, সেটা সম্পর্কে তাঁর মতকেই শেষ কথা বলে ধরে নিয়েছিলেন। আর সেকালে রেফারি বা রিভিউ সিস্টেমটা চালু ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। জার্মানি বা ইউরোপিয়ান জার্নালগুলোতে তখনো এই ধারা চালু হয়নি। তাই জার্নালের সম্পাদকের কাজটাকে কিছুতেই পক্ষপাতিত্বমূলক বলার উপায় নেই। আইনস্টাইনের ফুটনোটটাকে অগ্রাহ্য করার উপায়ও ছিল না সম্পাদক মহাশয়ের।

আইনস্টাইন মহাবিজ্ঞানী তখন। তাঁর কথার ওজন আলাদা। তাই পার্থ ঘোষ যে বলেছিলেন, ফুটনোটটিই সত্যেন বোসের দ্বিতীয় প্রবন্ধটিকে হত্যা করেছিল, এ যুক্তি ফেলে দেওয়া যায় না।

তিন

আসলেই কী লেখা ছিল সত্যেন বোসের লেখা মূল পেপারটিতে। মূল পেপারের কথা উঠছে এ কারণে, আইনস্টাইন জার্নালে পাঠানোর আগে সেটাতে ছুরি-কাঁচি চালিয়েছিলেন। একমাত্র বসুর মূল পেপারটি পাওয়া গেলেই সেটা নিশ্চিত হওয়া যেত। বোসের নিজের কাছে মূল পেপারের কপি ছিল না। আবার আইনস্টাইনের বেশির ভাগ পেপার খুঁজে বের করে সেগুলো ইসরায়েলের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষণ করা হয়। সেগুলোর মধ্যে বোসের দ্বিতীয় পেপারটি পাওয়া যায়নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক।

প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর জার্নালের কপি সত্যেন বোসকে পাঠানো হয়নি। পাঠানো হয়েছিল আইনস্টাইনের কাছে। সত্যেন বোস পরে যখন ইউরোপে যান গবেষণার জন্য, তখন আইনস্টাইনের কাছ থেকে পান সেই কপি।

আসলেই সত্যেন বোস স্পিন ধারণা দিয়েছিলেন কি না, সেটা এখন প্রমাণ করা মুশকিল। তবে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া কলেজের সাবেক অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ রায় একটি বই লেখেন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু: চেনা বিজ্ঞানীর অজনা কথা নামে। বইটি প্রকাশ করে কলকাতার বিখ্যাত আনন্দ পাবলিশার্স। সেই বইয়ে সত্যেন বোস যে আলোর কণাদের স্পিন ধারণার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, তিনি যুক্তিতর্ক ও ঐতিহাসিক কিছু দলিপত্র উত্থাপন করেছেন। সেসব দেখেশুনে মনে হয়, আসলেই সত্যেন বোস স্পিন ধারণার অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। সঙ্গে আইনস্টাইনের প্রথম জীবনীকার ডাচ পদার্থবিদ আব্রাহাম পাইজকে একহাত নিয়েছেন দেবীপ্রসাদ। আইনস্টাইনের জীবনী লিখতে গিয়ে পাইজ বারবার সত্যেন বোসের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে প্রতিবারই এমন কিছু মন্তব্য করেন বোস সম্পর্কে, যেগুলো অপমানজনক। বোসের স্পিন ধারণা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘আন্দাজে ঢিল ছুড়েছেন বোস।’ পাইজের অসৌজন্যমূলক বক্তব্য খণ্ডন করে কিন্তু অনেকগুলো নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন, সেগুলো থেকে উদ্ধৃতি টেনেছেন দেবীপ্রসাদ। শেষমেশ দেখাতে চেয়েছেন, সত্যেন বোস স্পিন ধারণার প্রথম প্রবক্তা।

দেবীপ্রসাদের বইয়ে অতি রোমান্টিকতা আছে, সত্যেন বোসকে স্পিন ধারণার প্রবর্তক প্রমাণের মরিয়া চেষ্টা আছে, তারপরও শুধু রোমান্টিকতার অজুহাতে তাঁর বইটাকে খারিজ করে দেওয়ার উপায় নেই। ইতিহাস সত্যের জয়গান গায়। সত্যেন বোস যদি সত্যি সত্যিই স্পিন ধারণার প্রবর্তক হন, একদিন হয়তো সে প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায়।

লেখক: সাংবাদিকসুত্র: সত্যেন্দ্রনাথ বসু: চেনা বিজ্ঞানীর অজানা কথা/ দেবীপ্রসাদ রায়—আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০১২সত্যেন্দ্রনাথ বসু: একটি জীবনকথা/ মানস প্রতিম দাস—রক্তকরবী, কলকাতা, ২০১৮সত্যেন্দ্রনাথ বসু: বোসন কণার জনক/ প্রদীপ দেব—মিরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৯*লেখাটি ২০২১ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

Read full story at source