মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য রক্ষায় কঠিন পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল

· Prothom Alo

অন্তত এখন পর্যন্ত একটা বিষয় নিশ্চিত, এই যুদ্ধে ইরান হারেনি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যদ্বাণী অযৌক্তিক ও অতি-আত্মবিশ্বাসী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত সামরিক চাপ প্রয়োগ করলেই তেহরান আত্মসমর্পণ করবে, এমন অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে। উল্টো এই সংঘাত পশ্চিম এশিয়াতে মার্কিন দমনমূলক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উন্মোচিত করেছে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংঘাতপ্রবণ নীতি ও মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাবে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ যে ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ছে, এটাও দিন দিন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

Visit h-doctor.club for more information.

গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষদের কাবু করতে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জোট বাঁধার নীতি ব্যবহার করে আসছে।

ইরান সংকট নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে

তবে ইরান ভেতর থেকে ভেঙেও পড়েনি, কৌশলগতভাবে পিছুও হটেনি। ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক জোট, প্রক্সি নেটওয়ার্ক আর হরমুজ প্রণালির কৌশলগত সুবিধা ব্যবহার করে তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা যেমন আছে, তেমনি যেকোনো বড় ধাক্কা সামলানোর শক্তি তাদের রয়েছে। তবু দীর্ঘ সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ ইরানিদের দুর্ভোগের বাস্তবতাও এতে আড়াল হয় না।

ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত হ্রাস করার জন্য চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে পর্দার আড়াল থেকে চাপ সৃষ্টির পথ খুঁজবে। মুখ রক্ষার জন্য ট্রাম্পের এখন কৌশল হবে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দাবি করে সামরিক বিজয় ঘোষণা করা। এতে এই যুদ্ধের সমাপ্তিকে পিছু হটার পরিবর্তে পরিকল্পিত সাফল্য হিসেবে দেখানো যাবে।

ট্রাম্প সম্ভবত এমন চেনা রাজনৈতিক কৌশল বেছে নেবেন। একদিকে সাফল্য ঘোষণা করবেন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে দর-কষাকষি চালিয়ে যাবেন। যদিও সমালোচকেরা একে পিছু হটা হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন, তবু ট্রাম্প প্রশাসন এই ফলাফলকে ট্রাম্পের শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে।

ইসরায়েলের আঞ্চলিক স্বার্থ প্রায়শই ওয়াশিংটনের বৃহত্তর হিসাব-নিকাশের সঙ্গে মেলে না। নেতানিয়াহুর সরকার যেখানে সামরিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন, রাশিয়া, ভঙ্গুর বৈশ্বিক বাজার ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে এমন একটি ধারণা জোরালো হচ্ছে যে ওয়াশিংটন এখন আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, বরং কেবল ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

তবে ট্রাম্প দেশের ভেতরে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছেন। ‘অনন্তকালের যুদ্ধ’ এড়ানো ও বিদেশে সামরিক অভিযানের বদলে মার্কিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল। এই সংঘাত তাঁর সে প্রতিশ্রুতিকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল রুটে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ ও জনগণের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ট্রাম্পের সমর্থন দ্রুত কমাতে পারে। মার্কিনিরা যদি অর্থনৈতিক দুর্ভোগে পড়ে যায়, তাহলে যে ঘটনাকে তারা দেশপ্রেমের শক্তি হিসেবে দেখেছিল, সেটাকেই দায়িত্বজ্ঞানহীন হঠকারিতা বলে ভাবা শুরু করবে।

সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েই যে আর রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করা যাবে না, এই ধারণাও জোরদার হয়ে উঠছে। মার্কিন ও ইসরায়েলের চাপ মোকাবিলায় ইরানের সক্ষমতা বৈশ্বিক দক্ষিণে পশ্চিমা কৌশলগত শক্তিমত্তার ভাবমূর্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

ইসরায়েলের যে হামলা ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জ্যামিতি বদলে দিল

এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে সম্ভবত সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার শর্তে, আংশিকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি থাকবে। এর ফলে ট্রাম্প এই পুরো বিষয়টিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সমস্যা হিসেবে না দেখিয়ে, একজন দক্ষ চুক্তি-নির্মাতা হিসেবে নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।

কিন্তু এই পথেও ঝুঁকি রয়েছে। সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনিদের একক আধিপত্য হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীন যদি পাকিস্তান, তুরস্ক বা উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো আঞ্চলিক পক্ষগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এই উত্তেজনা প্রশমনের মূল কারিগর হয়ে ওঠে, তবে ওয়াশিংটনের ‘শান্তির রূপকার’ চেহারা থাকবে না, বরং মনে হবে তারা বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা সমঝোতায় এসেছে। ট্রাম্পের মতো আধিপত্য জাহির করা নেতার জন্য এটা হবে খুবই অস্বস্তিকর একটি পরিস্থিতি।

আরব দেশগুলো নিরাপত্তার নামে যেভাবে প্রতারিত হলো

বৈশ্বিক দক্ষিণ এই যুদ্ধকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা না করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হিসেবে দেখছে। দীর্ঘদিন যাবৎ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, হস্তক্ষেপ বা কূটনৈতিক চাপের শিকার দেশগুলো ইরানের এই টিকে থাকাকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখছে। মার্কিন দমনমূলক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই চ্যালেঞ্জ মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প তাঁর মিত্রদের, বিশেষত ইসরায়েলকে ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামানোর জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এটাকে তিনি এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ হিসেবে দেখাতে পারেন। এখানেই মার্কিন-ইসরায়েল জোটের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়েনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কে আঞ্চলিক কৌশল নির্ধারণ করছে, তা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হচ্ছে।

নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক চাপ ও আহ্বান উপেক্ষা করে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানসহ নানাদিকে আগ্রাসী সামরিক নীতি বজায় রাখছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নেতানিয়াহু এই মুহূর্তে শান্তি চুক্তি করার চেয়ে তার কোয়ালিশন সরকার টিকিয়ে রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচানোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবে

সামরিক উত্তেজনা জারি রাখা নেতানিয়াহুর জন্য যেমন তাঁর রণকৌশলের অংশ, তেমনি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারও। সংবেদনশীল মুহূর্তে দর-কষাকষি ভেস্তে দেওয়ার পেছনে তাঁর হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়। নিশানা করে হত্যা বা এমন উসকানিমূলক পদক্ষেপ কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগকে নষ্ট করে সংঘাতময় পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলে।

ইসরায়েলের আঞ্চলিক স্বার্থ প্রায়শই ওয়াশিংটনের বৃহত্তর হিসাব-নিকাশের সঙ্গে মেলে না। নেতানিয়াহুর সরকার যেখানে সামরিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন, রাশিয়া, ভঙ্গুর বৈশ্বিক বাজার ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে এমন একটি ধারণা জোরালো হচ্ছে যে ওয়াশিংটন এখন আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, বরং কেবল ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

এসব সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাদের মধ্যে এমন এক মৌলিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, যা কোনো পক্ষই সহজে ত্যাগ করতে পারবে না। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থন ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও আইনি তদন্তের হাত থেকে ইসরায়েলকে হেফাজত দেয়। ফলে তাদের মতবিরোধ যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, দ্বিপক্ষীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখাটাই সব সময় মূল অগ্রাধিকার পায়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং মার্কিন প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্কটি সব সময়ই দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, কৌশলগত নির্ভরতা ও পারস্পরিক প্রভাবের এক জটিল রসায়ন। ইসরায়েলি নেতারা যদিও প্রায়শই কোয়ালিশন সরকারের চাপ ও জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখে বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন, তবু দিন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বের গুরুত্ব মেপেই তাদের এগোতে হয়।

কোনো একটি পক্ষ স্থায়ীভাবে সব ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছে, এমনটা ভাবার চেয়ে, এই সম্পর্কটিকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখাই ভালো। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অগ্রাধিকারগুলো প্রায়শই একে অপরের মুখোমুখি হয় এবং এই দুই দেশের লক্ষ্য সব সময় একই দিকে ধাবিত হয় না।

  • রঞ্জন সোলোমন একজন গবেষক ও ফ্রিল্যান্স লেখক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত

Read full story at source