রোনালদোর জোড়া গোল, কান্না ও শিরোপা জয়ের রাত
· Prothom Alo

ম্যাচ শেষ হতে তখনো মিনিট দশেক সময় বাকি। একটু আগেই দামাকের জালে নিজের দ্বিতীয় ও আল নাসরের চতুর্থ গোলটা করেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তাঁর সেই গোলে ম্যাচে ৪–১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া আল নাসরের শিরোপা জয় তখন অনেকটা নিশ্চিত। এরপরই দেখা গেল আবেগময় এক দৃশ্য। ফুটবল মাঠে এমন দৃশ্য প্রতিদিন দেখা যায় না, আর এসব দৃশ্য বা মুহূর্তের জন্যই হয়তো ফুটবল ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। হঠাৎই টেলিভিশন স্ক্রিনে দেখা গেল রোনালদো কাঁদছেন!
Visit tr-sport.bond for more information.
কাঁদতে কাঁদতে আঙুল তুলে স্ট্যান্ডে থাকা পরিবারের দৃষ্টি আকর্ষণের পর সেই কান্নার বেগ যেন আরও বাড়ল। অভূতপূর্ণ এক দৃশ্য বটে। কে ভেবেছিল, বিশ্বকাপ ছাড়া সম্ভাব্য সব শিরোপা জেতা রোনালদো সৌদি আরবের লিগ জিতে এভাবে কাঁদবেন!
৫টা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ১টি ইউরোসহ ৩৪টা শিরোপা জেতা রোনালদোর তো শিরোপা নিয়ে আকাঙ্ক্ষাই থাকার কথা নয়! তবে অপরিমিত এই সাফল্য–ক্ষুধার কারণেই রোনালদো আলাদা। এই ক্ষুধা ও তাড়নাই রোনালদোকে গড়ে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে। পাশাপাশি সৌদিতে প্রথম এই লিগ জয় রোনালদোকে নিয়ে অনেক সমালোচনার জবাবও।
রোনালদোর যে ‘খিদে কখনো কমে না’২০২৩ সালের শুরুতে আল নাসরে যোগ দেন রোনালদো। তাঁর আগমন সৌদি আরবের ফুটবলে বিপ্লব নিয়ে আসে। ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত পারফরম্যান্সও করে যান রোনালদো। কিন্তু শিরোপার ক্যাবিনেটটা একরকম খালিই পড়ে ছিল। ২০২৩ সালে জেতা আরব ক্লাব চ্যাম্পিয়নস কাপের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ (ফিফার স্বীকৃতি নেই) শিরোপাটাই ছিল সৌদি আরবে রোনালদোর একমাত্র অর্জন।
ফলে যতই দিন যাচ্ছিল চাপ ও সমালোচনা দুটোই বাড়ছিল। এর মধ্যে গত সপ্তাহে গামবা ওসাকার কাছে ফাইনালে হেরে আল নাসর হাতছাড়া করে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ টু শিরোপাও। সব মিলিয়ে রোনালদোর জন্য এবারের লিগ শিরোপা ছিল অগ্নিপরীক্ষার মতো। রিয়াদে সেই পরীক্ষা জয়ের আনন্দই গতকাল রাতে রোনালদোর চোখে ঝরল অশ্রু হয়ে।
ট্রফি নিয়ে রোনালদোদের উদ্যাপনসৌদি প্রো লিগ শিরোপা আল নাসর অবশ্য নিশ্চিত করতে পারত গত সপ্তাহেই। আল হিলালের বিপক্ষে ম্যাচ জিতলেই শিরোপা, এমন সমীকরণে ম্যাচের বেশির ভাগ সময় লিড ধরে রাখেন রোনালদোরা। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্তে গোলরক্ষকের ভুলে আত্মঘাতী গোল খেয়ে বসে আল নাসর।
Despite winning almost all trophies in Europe, Cristiano was seen crying after winning the league for Al Nassr. pic.twitter.com/NsclvTWQsK https://t.co/EMkaoICpof
— Goals Side (@goalsside) May 21, 2026
গতকাল রাতে আল ফাইহার বিপক্ষে ১–০ গোলে জিতেছে আল হিলাল। তাই আল নাসরকে দামাকের বিপক্ষে ম্যাচটি জিততেই হতো। কারণ, আল নাসর ড্র করলে দুই দলের পয়েন্ট হতো ৩৪ ম্যাচ শেষে সমান ৮৪। সে ক্ষেত্রে হেড–টু–হেড রেকর্ডে এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন হতো আল হিলালই।
এ সমীকরণ জেনে লিগ নিজেদের শেষ ম্যাচে শুরু থেকেই জয়ের জন্য মরিয়া ছিল আল নাসর। ৫১ মিনিটের মধ্যে ২–০ গোলে এগিয়েও যায় তারা। কিন্তু ৫৭ মিনিটে দামাক এক গোল শোধ করলে দুশ্চিন্তা বাড়ে আল নাসর শিবিরে। আশঙ্কার মেঘ কাটানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন রোনালদো নিজেই। ৬২ মিনিটে দুর্দান্ত এক ফ্রি–কিক গোলে আল নাসরকে এগিয়ে দেন ৩–১ গোলে। আর ৮০ মিনিটে করেন দলের চতুর্থ ও নিজের দ্বিতীয় গোলটি। দুই গোলেই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করে আল নাসরের ১১তম লিগ শিরোপা। ২০১৯ সালের পর প্রথম লিগ জিতল তারা।
শিরোপা জয়ের পর পরিবারের সঙ্গে রোনালদোক্যারিয়ারে রোনালদোর গোলসংখ্যা এখন ৯৭৩। অর্থাৎ হাজারতম গোল থেকে রোনালদো এখন মাত্র ২৭ গোল দূরে। আর আল নাসরের হয়ে এ মৌসুমে লিগে ২৮ গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করিয়েছেন।
বিশ্বকাপের আগে এই শিরোপা রোনালদোর আত্মবিশ্বাসের পালেও বাড়তি হাওয়া দেবে। বড় শিরোপা বিবেচনায় নিলে টানা ১৫ টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হওয়ার পর এই ট্রফিটি জিতলেন রোনালদো। এর ফলে চার দেশে লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেলেন ‘সিআর সেভেন’। এর আগে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ও সিরি আর শিরোপা জিতেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।
রোনালদোর উচ্ছ্বাসম্যাচ শেষে রোনালদোকে নিয়ে কথা বলেন তাঁর আল নাসর সতীর্থ জোয়াও ফেলিক্স। স্পোর্ট টিভিকে বলেন, ‘ক্রিস কয়েক বছর ধরেই এখানে নিজের প্রথম শিরোপা জেতার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে লিগ শিরোপাটা। কারণ, আরবে তারা অনেক বেশি ম্যাচ খেলে। আমি তো প্রতিদিনই ওর সঙ্গে থাকি, তাই জানি বিষয়টা।’
রোনালদোর কান্না নিয়ে ফেলিক্স বলেন, ‘আমি জানি, এটা নিয়ে ক্রিস্টিয়ানো কতটা ভেতরে–ভেতরে কষ্ট পায়। আমি জানতাম, সে এই শিরোপা জিততে কতটা উদ্গ্রীব ছিল। তাই আমি গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছি। তখন মনে হচ্ছিল, আর মাত্র কয়েক মিনিট, তারপরই কাজটা হয়ে যাবে।’