চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৯

· Prothom Alo

বৃষ্টি পড়ছে সান্তিয়াগো শহরে

চিলি আসার পরিকল্পনা যখন থেকে করছি, তখন থেকেই মাথায় ঘুরছে বীর নেতা আলেন্দে, ভিক্টর হারা, পাবলো নেরুদার নাম। রাতে হোস্টেল ম্যানেজার বারবারা বলে দিয়েছেন, হোস্টেল থেকে বেরিয়েই সামনের রাস্তা ধরে বাঁয়ে হাঁটতে হবে মিনিট দশেকের কম। একসময় আমি নাকি নিজেই বুঝতে পারব আমি পৌঁছে গেছি এক জাদুঘরের কাছে। যেটা বলেছেন, ঠিক সেটাই ঘটেছে। জাদুঘর খুঁজে পেতে আমার ঘাম ছোটেনি।

একটি তরুণ আর এক তরুণী দাঁড়িয়ে সংগ্রহশালার প্রবেশপথে। এখানে কি কোনো টিকিট কাউন্টার আছে? জানতে চাইলাম। মেয়েটি বলল এটা ফ্রি। আরও বলল, আমরা দুজনও এটা দেখতে এসেছি, চলো, আমরা তিনজন একসঙ্গে যাই? মেয়েটির ইংরেজি শুনে আর আমন্ত্রণ পেয়ে আমি স্বস্তি পেলাম। এ তল্লাটে ইংরেজি শোনাই যায় না। মেয়েটি চিলিয়ান। ছেলেটি তার প্রেমিক, এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে। মেয়েটির নাম পাজ, ছেলেটির  মেথিয়াস। মেয়েটি তার প্রেমিককে চিলির বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখাচ্ছে। আমি তাদের সঙ্গে মিশে গেলাম।

Visit freshyourfeel.org for more information.

সামনের বড় ফটকে স্প্যানিশ ভাষায় যা লেখা, তার ইংরেজি করলে হবে ‘মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’। জাদুঘরের প্রবেশমুখ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই হাতের বাঁয়ে মানুষের জটলা। কিছু না বুঝেই আমি আর মেথিয়াস পাজকে অনুসরণ করলাম। দেখি দেয়ালজুড়ে একটি কবিতা লেখা হয়েছে। এ কবিতা হারার। ভিক্টর হারার শেষ কবিতা ‘এস্তাদিও চিলি’। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা।

মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি অ্যান্ড হিউমান রাইটসের সামনে লেখক

ভিক্টর হারা চিলিয়ান সংগীতজ্ঞ, নাট্যগুরু, রাজনীতিক, শিক্ষক, কবি। আমি স্প্যানিশ না জানতে পারি, তবে এর মর্মবাণী আমার অচেনা নয়। হারার গান মানবাধিকারের বার্তা দেয়। যেন এই কবিতা আমাদের নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা! পাজ বলল, কবিতাটিতে হারার কারাবাসের সময়ের আবেগ প্রতিফলিত হয়েছে, বন্দীদের ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩। ক্ষমতায় চিলির কমিউনিস্ট প্রেসিডেন্ট আলেন্দে। আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সামরিক জান্তা বোমাবর্ষণ করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে, জেনারেল অগাস্টো পিনোশের নেতৃত্বে। না, আলেন্দে সেদিন ধরা দেননি, ধরা না দেওয়ার জন্যই আত্মহত্যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ভবনে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেই সামরিক অভ্যুত্থান। ভিক্টর হারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের সমর্থক। শুনেছি প্রায়ই গান  শোনাতেন আলেন্দেকে।

বন্দী নির্যাতনে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ

জেনারেল পিনোশে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার পর শুরু হয় হত্যা, নির্যাতন, গুম। সামরিক অভ্যুত্থানের পরের দিন গ্রেপ্তার হন ভিক্টর হারা। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় চিলি স্টেডিয়ামে। সেখানে ধরে আনা হয়েছে আরও অনেক অনেক ছাত্র–জনতাকে।

বন্দীদের সঙ্গে চলছে নৃশংস আচরণ। ভিক্টর হারা তাঁর সর্বজনীনতার কারণেই এক আলাদা ব্যক্তিত্ব সেদিন সে স্টেডিয়ামে। স্টেডিয়ামের মাঠেই লিখেছেন যে কবিতা, যা আমি দেখছি এ দেয়ালে। কবিতায় সুর দিয়েছেন, মৃত্যুর আগে গেয়েছেন। হারাকে কয়েক দিন ধরে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তাঁর হাত এবং আঙুলগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। তাঁর সংগীতের শক্তিকে নিস্তেজ করাই ছিল উদ্দেশ্য। আটকের চার দিন পর মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয় সান্তিয়াগোর মেট্রোপলিটন কবরস্থানের কাছে। পরে তাঁর স্ত্রী তাঁর দেহ শনাক্ত করেন।

সংগ্রহশালার অভ্যন্তরে স্মৃতিচিহ্ন

কবিতাকে বিদায় দিয়ে প্রবেশ করলাম জাদুঘরে। রিসেপশনের কাছেই ছোট ছোট লকারের মতো আছে, সেটারই একটাতে আমার পিঠের ব্যাগ রেখে দিলাম, তবে ক্যামেরা সঙ্গে রাখতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। নিচতলার ফটোগ্রাফির সংগ্রহ দেখে বোঝা গেল ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পিনোশের সামরিক স্বৈরশাসনের সময় যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, তার স্মরণে এ সংগ্রহশালা। এ জাদুঘরের লক্ষ্য এটি প্রচার করা। মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং এই সময়ের মধ্যকার দেশের ইতিহাস সম্পর্কে পৃথিবীকে জানানো।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে দেয়ালজুড়ে ভিক্টর হারা দাঁড়িয়ে, হাতে গিটার। হাস্যোজ্জ্বল তাগড়া জোয়ান ভিক্টর দেয়ালজুড়ে হাসছেন। তারুণ্যের নায়ক হারা। সংস্কৃতির নায়ক হারা। বিজয়ের উল্লাসে উচ্ছ্বসিত কয়েকজন শিশু-কিশোরের ছবিও হারার ছবির পাশে।

সংগ্রহশালার অভ্যন্তরে স্মৃতিচিহ্ন

উঠে গেলাম দোতলায়। বৃহৎ কক্ষজুড়ে বেশ কয়েকটি মনিটর। প্রতিটিতে চলছে চলচ্চিত্র। স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দর্শনার্থীদের, ইতিহাসের সেই দমন-নিপীড়ন। একই চলচ্চিত্র বারবার করে প্রদর্শিত হচ্ছে। চারদিকে নির্যাতন আর গুমের ছবি। এখানে পরিবেশ ভারী। কারও মুখে কোনো টুঁ–শব্দ নেই। পাশের কক্ষগুলো অতিক্রম করছি ধীর পায়ে। দেয়ালে সেঁটে দেওয়া আছে কিছু চিঠি; আটককেন্দ্রে বন্দীদের পরিবারের সদস্যদের পাঠানো চিঠি সেগুলো। হাতে লেখা চিঠি। অন্য কক্ষে পেলাম সংবাদপত্রের টুকরা অংশ এবং বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের নানান সাক্ষ্য।

পাজ বলল আমায়, পরিবারের সদস্যরা লিখেছেন, কারাগারের বন্দীদের কাছে সেগুলো সংগ্রহ করে রাখা আছে এখানে। সে উত্তাল সময়কার পত্রিকার নানা পাতা ভার্চ্যুয়াল স্টাইলে প্রদর্শিত হচ্ছে দীর্ঘকায় কাচের দেয়ালে। কক্ষজুড়ে বন্দী এবং গুম হয়ে যাওয়া বন্দীদের অটোগ্রাফ, নথি, চিঠি, সাক্ষ্য, ব্যাগ, জুতা, জামা আরও ব্যবহারের সামগ্রী এবং অডিওভিজ্যুয়াল সামগ্রী। পঞ্চাশ বছর আগের অস্থির এক সান্তিয়াগো এ সংগ্রহশালায়।

জাদুঘরের ভিতরে

পাজের প্রেমিক মেথিয়াস আমায় বলল, একটা বিষয় খেয়াল করেছ কি? এ জাদুঘরের যে অবকাঠামো, তার কনসেপ্টই হচ্ছে আলো এবং স্বচ্ছতা। তাই তো এ কাঠামোর মধ্যে রয়েছে কাচ। জাদুঘরের চারদিকের দেয়াল কাচের। বাইরের সূর্যটা যেন সব আলো নিয়ে এখানে ঢুকে বসে আছে। বিল্ডিংটি ব্রাজিলিয়ান স্থপতি মার্কোস ফিগেরা ডিজাইন করেছেন। আলো এবং স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্থপতি ইতিহাসের একটি অন্ধকার সময়ের ওপর আলোর প্রবাহ নিশ্চিত করতে।

পাজ বলল এ সংগ্রহশালার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো যত বন্দী গুম হয়েছেন আর ফিরে আসেননি, তাঁদের মুখের ছবি দিতে তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ দেয়াল। প্রাচীরের মতো দেখতে হয়েছে সে দেয়াল। নিখোঁজ বন্দীদের প্রাচীর। নাম তার ‘ওয়াল অব ডিজঅ্যাপিয়ার্ড ডিটেইনিজ (Wall of Disappeared Detainees)’।

ওয়াল অব ডিজঅ্যাপিয়ার্ড ডিটেইনিজ–এর সামনে লেখক

একটি সুউচ্চ দেয়ালে সব মৃত মানুষের ছবি সাঁটানো আছে। এ দেয়ালের উল্টা দিকেই রাখা আছে টেলিভিশনের মতো একটি মনিটর। সে মনিটরে আছে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখের ছোট ছোট ভার্চ্যুয়াল ছবি। একটা মুখের ওপর আঙুলের ডগা দিতে চাপ দিতেই সে বিপ্লবীর ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত পুরো মনিটরে ভেসে ওঠে। প্রযুক্তির এমন ব্যবহার আমি আগে কোনো সংগ্রহশালায় দেখিনি।  

আমি আমার কৌতূহলবশত দু-তিনজন অচেনা বিপ্লবীর ছবির ওপর আমার আঙুল ছোঁয়ালাম। ওঁরা এক এক করে বেরিয়ে এসে আমায় পরিচয় দিলেন—কবে জন্মেছেন, কবে গ্রেপ্তার হলেন, ঠিকানা ইত্যাদি। মনে হলো কত দিনের চেনা ওঁরা আমার। এ কক্ষের চারদিকে মেঝেতে অনেকগুলো মোমবাতি জ্বলছে। পাজ বলল এগুলো কৃত্রিম মোমবাতি। দেখে মনে হলো এসব কৃত্রিম মোমবাতিও এখানে তাদের কৃত্রিমতা হারিয়েছে, যেন জ্বলছে আর পুড়ছে।

নির্যাতনে ব্যবহৃত একটি ইলেকট্রিক ডিভাইস দেখিয়ে পাজ আমায় বলল, ‘আমার বাবা সে সময় আর্মি অফিসার ছিলেন, আমার বাবা জেনারেলের আদেশ মানেননি। উনি বন্দীদের নির্যাতন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। শাস্তি হিসেবে আমার বাবাকে দীর্ঘদিন জেলে কাটাতে হয়েছে।’

আরে, এ তো এক বীরের কন্যা দাঁড়িয়ে আমার কাছে! ওর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় আমার মন আচ্ছন্ন হলো।  

মনে পড়ছে চিলিয়ান চলচ্চিত্রকার হেলভিও সোতোর কথা। এ ইতিহাস নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র ‘It’s Raining on Santiago’। ‘বৃষ্টি পড়ছে সান্তিয়াগো শহরে’—এটি ছিল একটি কোড বা বার্তা। সামরিক অভ্যুত্থান শুরু করার জন্য মিলিটারিরা এটিকেই সংকেত হিসেবে ব্যবহার করেছিল বলে দেখান পরিচালক হেলভিও সোতো তাঁর সিনেমায়।

বেরিয়ে এলাম মিউজিয়াম থেকে। আজ বৃষ্টি নেই সান্তিয়াগোর আকাশে। চারদিকে ঝকঝকে রোদ। কিন্তু আমার ভেতরটা আর্দ্র হয়ে আছে।

ছবি: লেখক

Read full story at source