মেসি থেকে ইয়ামাল: বিশ্বকাপের তারকা গড়ার বিদ্যালয় লা মাসিয়া

· Prothom Alo

বিশ্বকাপের তারকারা জন্ম নেন না এক দিনে। বছরের পর বছর অনুশীলন, শৃঙ্খলা আর এক বিশেষ দর্শনের মধ্য দিয়ে তাঁরা বেড়ে ওঠেন। সেই দর্শনের নাম লা মাসিয়া—যেখান থেকে উঠে এসেছেন মেসি, ইয়ামালসহ বিশ্ব ফুটবলের বহু কিংবদন্তি।

Visit biznow.biz for more information.

বিশ্বকাপের মঞ্চে আমরা দেখি গোল, ট্রফি, উল্লাস আর চোখের জল; কিন্তু সেই আলোঝলমলে মুহূর্তগুলোর পেছনে থাকে বছরের পর বছর ঘাম, ত্যাগ আর স্বপ্নের গল্প। কারও পথচলা শুরু হয় পাড়ার ছোট্ট মাঠে, কারও বাবার হাত ধরে স্থানীয় ক্লাবে। আবার অনেকের স্বপ্নের প্রথম ঠিকানা স্পেনের বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ফুটবল একাডেমি—লা মাসিয়া।

এই সেই একাডেমি

এই একাডেমিতেই ফুটবলের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। আজ একই একাডেমির উত্তরসূরি হিসেবে বিশ্বমঞ্চ মাতাচ্ছেন স্পেনের নতুন প্রজন্মের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। প্রজন্ম বদলেছে; কিন্তু লা মাসিয়ার দর্শন বদলায়নি।

হাজারো কিশোরের স্বপ্নের ঠিকানা

অসংখ্য শিশু–কিশোরের স্বপ্নের ঠিকানা

অনেকেই লা মাসিয়াকে শুধু একটি ফুটবল একাডেমি মনে করেন; কিন্তু এটি আসলে একটি দর্শন। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই একাডেমির নাম এসেছে ১৭০২ সালে নির্মিত একটি ঐতিহ্যবাহী কাতালান খামারবাড়ি থেকে।
এখানে শুধু ড্রিবলিং, পাসিং কিংবা গোল করার কৌশল শেখানো হয় না; সমান গুরুত্ব পায় শৃঙ্খলা, পড়াশোনা, দলগত চেতনা, বিনয় এবং অন্যকে সম্মান করার শিক্ষা। বার্সেলোনার দর্শন একবাক্যেই ধরা পড়ে, ‘আমরা শুধু ফুটবলার নয়, মানুষও গড়ে তুলি।’
এই দর্শনের ফলেই বিশ্ব ফুটবল পেয়েছে লিওনেল মেসি, জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কার্লেস পুয়োল, সার্জিও বুসকেতস, জেরার্ড পিকে, সেস্ক ফাব্রেগাস, পেদ্রো ও ভিক্টর ভালদেসের মতো কিংবদন্তিদের।

১৩ বছরের এক আর্জেন্টাইন কিশোর

View this post on Instagram

A post shared by FC Barcelona (@fcbarcelona)

২০০০ সাল। মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর আর্জেন্টিনার রোজারিও ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে চলে আসে বার্সেলোনায়। নাম তাঁর লিওনেল মেসি। শারীরিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিল বার্সেলোনা; কিন্তু ক্লাবটি শুধু একটি শিশুর চিকিৎসাই করেনি; তারা বিশ্ব ফুটবলকে উপহার দিয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা শিল্পীকে।

লা মাসিয়ার ছাত্রাবাসেই বড় হয়ে উঠেছেন মেসি। একই ডাইনিং হলে খাওয়া, একই মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন, একই ছাদের নিচে শত শত কিশোরের সঙ্গে স্বপ্ন দেখা—এই পরিবেশই তাঁর ফুটবল-দর্শন গড়ে দেয়। সেখানেই তিনি শিখেছিলেন, ফুটবল শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের খেলা নয়; এটি দল, ধৈর্য, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বেরও খেলা।
বার্সেলোনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো—সবকিছুর বীজ যেন বপিত হয়েছিল লা মাসিয়ার সেই ছাত্রাবাসেই।

বিশ্বকাপে আজও লা মাসিয়ার ছাপ

মেসি, জাভি কিংবা ইনিয়েস্তার যুগ শেষ হলেও লা মাসিয়ার গল্প শেষ হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের জার্সিতে খেলছেন লামিনে ইয়ামাল, জাভি, পাউ কুবারসি, আলেহান্দ্রো বালদে ও ফার্মিন লোপেজ। নতুন প্রজন্মের এই ফুটবলাররা প্রমাণ করে দিচ্ছেন, লা মাসিয়া এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিভা তৈরির বিদ্যালয়।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি যেন দুই প্রজন্মের মধ্যে এক জীবন্ত সেতুবন্ধ। একদিকে ইতিহাস, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ; আর মাঝখানে লা মাসিয়ার উত্তরাধিকার।

একই স্কুল, ভিন্ন দেশের জার্সি

বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর দৃশ্য হলো, একই একাডেমিতে বেড়ে ওঠা দুই বন্ধু ভিন্ন দেশের জার্সিতে মুখোমুখি দাঁড়ায়। জাতীয় সংগীত আলাদা, পতাকা আলাদা, ভাষাও আলাদা; কিন্তু বল পায়ে নিলেই বোঝা যায়, তাঁদের ফুটবলের ভাষা এক।
ছোট ছোট পাস, বলের প্রতি সম্মান, দ্রুত সিদ্ধান্ত আর দলগত খেলায় বিশ্বাস—এসবই লা মাসিয়ার শিক্ষা।

একটি একাডেমির বৈশ্বিক প্রভাব

View this post on Instagram

আজ ইউরোপের প্রায় সব বড় ক্লাবই নিজেদের যুব একাডেমিতে নতুন করে বিনিয়োগ করছে। কারণ, লা মাসিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, কোটি কোটি ইউরো খরচ করে তারকা কেনার চেয়ে নিজেরাই তারকা তৈরি করা অনেক বেশি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের পথ।
২০১০ সালের ব্যালন ডি'অরের শেষ তিনজন মেসি, জাভি ও ইনিয়েস্তা—তিনজনই ছিলেন লা মাসিয়ার ছাত্র। আবার ২০১১ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে বার্সেলোনার শুরুর একাদশের সাতজনই উঠে এসেছিলেন এই একাডেমি থেকে। ফুটবল ইতিহাসে এমন নজির বিরল।

লা মাসিয়ার গল্পে বাংলাদেশের নাম

লা মাসিয়ার গল্প এখন শুধু স্পেন বা আর্জেন্টিনার নয়। সেই গল্পে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশের একটি নামও।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শেখ আশিক শায়ান এখন লা মাসিয়ার শিক্ষার্থী। প্রতিদিন বিশ্বের সেরা তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে অনুশীলন করছে সে। স্বপ্ন—একদিন বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
যে করিডরে একদিন কিশোর মেসি হেঁটেছিলেন, আজ সেই একই করিডরে হাঁটছে বাংলাদেশের এক কিশোর। ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে শায়ানের উপস্থিতি একটি বিষয় স্পষ্ট করে—প্রতিভা ও স্বপ্নের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

পৃথিবীর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা বিজ্ঞানী তৈরি করে। খুব কম প্রতিষ্ঠানই আছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা কোটি কোটি মানুষকে একই সঙ্গে আনন্দ, বিস্ময় আর আবেগে ভাসিয়ে দিতে পারে। লা মাসিয়া তেমনই এক বিদ্যালয়।

এখানে শুধু ফুটবলার তৈরি হয় না; গড়ে ওঠে চরিত্র, দর্শন এবং একটি ফুটবল সংস্কৃতি। একসময় এই একাডেমি পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিল লিওনেল মেসিকে। আজ সেখান থেকেই উঠে আসছেন লামিনে ইয়ামাল। আর সেই স্বপ্নের সারিতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শেখ আশিক শায়ান।

হয়তো এটাই লা মাসিয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়—এখানে জন্মস্থান নয়, একজন ফুটবলারের প্রকৃত পরিচয় গড়ে দেয় তার স্বপ্ন, পরিশ্রম ও মূল্যবোধ।

ছবি: সামাজিক মাধ্যম

Read full story at source