দুর্গম চরে শিশুদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে বন্ধুসভা

· Prothom Alo

বছর দুয়েক আগের কথা। তখন রংপুরে তীব্র শীত। কিছুদিন পর শীতার্ত মানুষের জন্য আসবে প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল। কোথায় এই কম্বল দেওয়া যায়, তাই নিয়ে আলোচনায় বসেছেন রংপুর বন্ধুসভার বন্ধুরা। প্রস্তাব ওঠে তিস্তার দুর্গম হরিণচওড়া মাঝের চরে এগুলো উপহার দেওয়া হোক।

Visit fish-roadgame.online for more information.

চরটি ভৌগোলিকভাবে লালমনিরহাট জেলায় অবস্থিত। তবে নদীবেষ্টিত হওয়ায় লালমনিরহাটের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। সেখানকার মানুষ জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করেন রংপুরের হারাগাছ পৌরসভা থেকে। সেই শীতে তিস্তার মাঝের চরে প্রথম পা পড়ে রংপুর বন্ধুসভার বন্ধুদের। শীতার্ত মানুষদের জন্য নিয়ে যান কম্বল। প্রথমে নৌকায় করে পার হতে হয় নদী। এরপর হেঁটে যেতে হয় প্রায় দুই কিলোমিটার বালুময় পথ। স্থায়ী কোনো রাস্তাঘাট নেই। প্রতিবছর নদীভাঙন ও বন্যার সঙ্গে পরিবর্তন হয় পথের দিশা। শিশুদের জন্য নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চরের ৪০০ পরিবারের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা।

কলোনির অফিসে চলছে আলোর পাঠশালার কার্যক্রম। ক্লাস নিচ্ছেন বন্ধুসভার বন্ধুরা

চরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ভালো কিছু করে তাঁদের কষ্ট লাঘব করার শপথ নেন বন্ধুরা। এরপর কয়েক ধাপে অনেক পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো জরুরি বিষয়গুলোর ওপর জরিপ করেন। জরিপে সহায়তা করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।

জরিপে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযুক্ত ৯০ শতাংশের বেশি শিশু পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না। অল্প কিছু শিশু পাশের হরিণচওড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে অনিয়মিতভাবে। বর্ষায় বন্যা বা সচেতনতার অভাবে তাদের নিয়মিত শিক্ষার্থী হয়ে ওঠা আর হয় না। প্রতিবছর বন্যায় ঝরে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী। এরপর যোগ দেয় কৃষিকাজ বা পশুপালনে। অবশ্য কিছু শিশু ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছে নিজেদের টাকায় পরিচালিত একটি বেসরকারি মাদ্রাসায়।

বেশ কিছু উঠান বৈঠকের পর বন্ধুরা চরটির শিশুদের জন্য শিক্ষা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম আলোর ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান বন্ধুরা। পরপর বেশ কয়েকটি উঠান বৈঠকে স্থানীয়দের বোঝানো হয় শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব। ধারাবাহিক প্রস্তুতিতে এগোতে থাকে বন্ধুসভার কাজ।

শিশুদের মধ্যে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রংপুর বন্ধুসভার মেহেদি উৎসব

গত বছরের ২৪ অক্টোবর, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এই চরের ৪৬ শিশুকে নিয়ে চালু হয় সাপ্তাহিক স্কুল ‘আলোর পাঠশালা’। পাঠশালার উদ্বোধন করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ছকিম উদ্দিন।

বন্ধুরা জানান, প্রাথমিক উদ্দেশ্য শিশুদের লিখতে ও পড়তে সাহায্য করা। পাশাপাশি নদীর ওপারে হরিণচওড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক সিলেবাস সমন্বয় করা।

শুরুর দিকে সপ্তাহে দুই দিন শুক্র ও শনিবার পাঠদান হতো। রংপুর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাস নিতে যেতেন বন্ধুরা। কিন্তু দিন দিন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের চাপ বাড়তে থাকে, যেন পাঠদানের সময় বাড়ানো হয়।

শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে বই বিতরণ

স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের শিক্ষকতায় সম্পৃক্ত করা হয়। যাঁরা আবার নিজেরা পড়াশোনা করেছেন চরটির বাইরের আত্মীয়ের বাসায় থেকে। স্থানীয় শিক্ষকেরা হলেন—মোরশেদুল ইসলাম, আমজাদুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার, আজম মিয়া ও ফাতেমা খাতুন।

শুরু হয় আলোর পাঠশালার নতুন যাত্রা। শুক্রবার বন্ধ রেখে সপ্তাহে ছয় দিন স্কুলে ক্লাস নেওয়া শুরু করেন নতুন শিক্ষকেরা। প্রতিদিন ক্লাস হয় সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর বয়স ৬ থেকে ৯ বছর। বর্তমানে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসে। সাময়িকভাবে নিয়মিত ক্লাস হলেও অভিভাবকেরা নানা বিষয় নিয়ে চিন্তিত। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ছকিম উদ্দিন বলেন, ‘যে ছাওয়ারা (শিক্ষক) ক্লাস নেয় ওরাও তো কলেজ যায়। নানান কাজ করে। ওরা না থাকলে ক্লাস কায় নেবে।’

স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় ক্লাস নেওয়া হয় গাছতলায়। শীত ও বৃষ্টিতে তাই বাচ্চাদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তীব্র শীতে মাটির ওপর পাটিতে বসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্ষা এলে প্রায়ই বন্ধ রাখতে হয় স্কুল। তবে এবারের বর্ষায় স্থানীয়রা সেখানকার সরকারি কলোনির একটি অফিসঘর সাময়িকভাবে পড়ানোর জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তবে এটি স্থায়ী বন্দোবস্ত নয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বন্ধুসভার বন্ধুসভার বন্ধুদের সহযোগিতায় আলোর পাঠশালার যাত্রা শুরু হয়

এ বিষয়ে প্রথম আলোর রংপুরের ফটোসাংবাদিক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘আলোর পাঠশালা নিয়ে আমরা আশাবাদী। কিন্তু স্থায়ী অবকাঠামো, নিয়মিত পাঠদান ও অভিভাবকদের সচেতন করে তোলাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যদি কেউ বাচ্চাদের স্কুলের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো করে দিতে পারেন তাহলে তাঁরা জমির ব্যবস্থা করে দেবেন।

এ ছাড়া বর্ষায় তিস্তার পানি বেড়ে গেলে প্রতিবছরই চরটি বন্যায় প্লাবিত হয়। তখন বন্ধ থাকে স্কুল। বন্যার পর দেখা দেয় পানিবাহিত নানা রোগ। পেটে কৃমি, অপুষ্টি, চর্মরোগ, রক্তশূন্যতা এসবের প্রকোপ বেশি। কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় বাচ্চাদের।

তবে হতাশ নন রংপুর বন্ধুসভার বন্ধুরা। সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দিকে বাচ্চারা আসত খালি পায়ে, উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে। কিন্তু ক্লাসে স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে বোঝানোর পর তারা স্যান্ডেল পরে পরিপাটি হয়ে আসে। এসব পরিবর্তন দেখে আশাবাদী না হয়ে পারি না। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সঠিক পরিচর্যা পেলে এই শিশুরাই একদিন চরে আলো আনবে।’

Read full story at source