আমদানিনির্ভরতায় ভুগছে জ্বালানি খাত

· Prothom Alo

দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও ৯ শতাংশের উৎস আমদানি। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে বেড়ে গেছে গ্যাসের সংকট। আমদানি করা বিদ্যুৎ থেকেও কমেছে সরবরাহ। তাই বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতার কারণেই ভুগছে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, অগ্নিদুর্ঘটনায় এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার তা কিছুটা বাড়ে। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ আবার কমেছে। এতে দিনে ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। সমুদ্রে পরিস্থিতির উন্নতি হলে আজ বুধবার থেকে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম গতকাল সকালে প্রথম আলোকে বলেন, এলএনজির কার্গো (জাহাজ) পাশেই আছে। বৈরী আবহাওয়ার জন্য টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর করা যায়নি। গ্যাসের সরবরাহ দ্রুত বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ।

আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট ও দেশি কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়, বেড়ে যায় সংকট। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত হয়। যানবাহনেও সিএনজি পেতে দীর্ঘ সারি পড়ে যায় ফিলিং স্টেশনে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক যেকোনো সংকটে বারবার ব্যাহত হয় দেশের জ্বালানি সরবরাহ। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায়। জ্বালানির সরবরাহ কমায় দেখা দেয় লোডশেডিং। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা চালায়। ইরান পাল্টা হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হয়। এবার আগুনে একটি টার্মিনাল বন্ধের পর বেড়ে গেছে গ্যাসের সংকট। এর আগে ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রায় সাড়ে তিন মাস বন্ধ ছিল একটি টার্মিনাল। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলেই এলএনজি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। গত সোমবার এলএনজি নিয়ে নতুন জাহাজ এলেও তা টার্মিনাল খালাস করা যায়নি বৈরী আবহাওয়ার কারণে।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার আছে। প্রতিটি বয়লারের সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি থেকে গত বৃহস্পতিবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করতে কাজ চলছে। এটি চালু করার জন্য প্রস্তুত হলে তা পরীক্ষা করতে বর্তমানে চালু বয়লারটি বন্ধ করতে হবে। ওই সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। অন্তত ১২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তাই ছুটির দিনে গ্যাসের চাহিদা কম থাকার সময় এ কাজ করতে চায় পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার দুজন কর্মকর্তা বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সরবরাহ চালুর বিষয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে এক্সিলারেট এনার্জিকে। এরপর জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ সপ্তাহে এক্সিলারেট থেকে গ্যাস সরবরাহ আর বাড়বে না।

বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি

দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধের পর টানা চার দিন সক্ষমতার বেশি এলএনজি সরবরাহ করেছে সামিটের টার্মিনাল। ওই সময় দিনে প্রায় ৫৭ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করেছে তারা। এর পর থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নিতে না পারায় গত সোমবার সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেয় সামিট।

গ্যাস সরবরাহে যুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের সূত্র বলছে, গতকাল সন্ধ্যায়ও ২০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করেছে সামিট। আর ৩০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করেছে এক্সিলারেট এনার্জি। দেশীয় গ্যাস থেকে এসেছে ১৬৩ কোটি ঘনফুটের মতো। তার মানে সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২১৩ কোটি ঘনফুট। গত তিন সপ্তাহের মধ্যে এটি সবচেয়ে কম সরবরাহ। চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোকে। আজ নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নিতে না পারলে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে যাবে।

দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানিসংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। গতকাল ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার টেকসই উন্নয়ন করেনি। তাই এলএনজির একটা টার্মিনাল বন্ধে সারা দেশে গ্যাসের হাহাকার পড়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া, সরকার সেটা সামাল দিচ্ছে।

গতকাল দুপুরে একই সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ফারাক আছে। জ্বালানির ক্ষেত্রেও তাই। জ্বালানিসংকটে মানুষের কষ্ট লাঘবে চেষ্টা করছে সরকার।

গরমে কমছে না লোডশেডিং

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে না পারায় গতকালও কমেনি লোডশেডিং। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। গত রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সোমবার এটি বেড়ে হয় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। ওই দিন সন্ধ্যায় টানা বৃষ্টির পর কিছুটা কমে আসে। তবে গতকাল দুপুর থেকে আবার বাড়তে থাকে। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে বেলা তিনটায়, ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গরম বাড়লেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু চাহিদামতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাসের সংকটে উৎপাদনে কমেছে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট। দুটি কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে। ব্যয়বহুল বলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তেলচালিত কেন্দ্র বেশি চালালে পিডিবির লোকসান বেড়ে যাবে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে পেট্রোবাংলাকে অনুরোধ করা হয়েছে। আর কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া থাকায় কয়লার আমদানি ব্যাহত হয়েছে। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। ঝড়-বৃষ্টিতে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি কেন্দ্রটি। আজ উৎপাদন বাড়ার কথা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দেয়নি গত আওয়ামী লীগ সরকার। এখন গ্যাসের উৎপাদন টানা কমছে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় ২০১৩ সাল থেকে। এখন জ্বালানিসংকটের তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই, আমদানি করতেই হবে। এর পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানির উৎস বাড়াতে হবে। যদিও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিয়েছে বর্তমান সরকার। সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বেশি আগেই আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। এটি না হলে হয়তো আজ এমন সংকট হতো না। তবে দুর্নীতি, লুণ্ঠন বন্ধ করলে আর্থিক চাপ তৈরি হতো না। এ ছাড়া আমদানি ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক হলেও সংকট এড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবহার করতে হবে। কয়লা আমদানি না করে জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ বাড়বেই।

Read full story at source