ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছে
· Prothom Alo

ইরান যুদ্ধ হয়তো দূরনিয়ন্ত্রিত বিমান হামলা ও আকাশপথেই লড়া হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধের আসল ভাগ্য বা কৌশলগত পরিণতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে সমুদ্র।
সাম্প্রতিক সময়ের হামলা ও পাল্টা হামলা এই বাস্তবতা তৈরি করেনি, বরং এটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন হয়তো এখন স্থলভাগে সেনা অভিযান, ইরানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো জরুরি অবকাঠামোতে হামলা, কিংবা ইসফাহান প্রদেশের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর গভীরে লুকিয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনে সংঘাত বাড়াতে পারে।
Visit tr-sport.bond for more information.
এসব পদক্ষেপে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যুদ্ধও ছড়াবে, সন্দেহ নেই। তবে এতে সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রাখা ইরানের নৌ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধসে পড়বে না, কিংবা প্রণালি হিসেবে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বও কমবে না।
গত মাসেই তেহরানে দেখা গেছে এই যুদ্ধের এক রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল শোক পালনের অনুষ্ঠান ছিল না; ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো আর বোমাবর্ষণের পর ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা কতখানি বজায় রাখতে পেরেছে, এটি ছিল তারই এক শক্তি প্রদর্শন।
ইরান নিজেকে টিকিয়ে রাখতে শত্রুর সঙ্গে যেভাবে সমঝোতা করেইরান যেভাবে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের কল্পনা করছেএই টিকে থাকার শক্তি কেবল সমুদ্র তৈরি করেনি, তবে সমুদ্র সেই শক্তিকে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত না থাকা সত্ত্বেও ইরান পশ্চিমাদের ভারী আক্রমণ হজম করতে পেরেছে একটি বড় কারণে—সমুদ্রে তাদের একটি জবরদস্তিমূলক দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল। আকাশে চালানো প্রতিটি হামলার একটি বিশাল মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাজধানী, বিমা কোম্পানি ও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিতে বাধ্য করতে পারেনি—যেমনটা একসময় রুহুল্লাহ খোমেনি করেছিলেন।
দেখা গেল, ট্রাম্প নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে পড়েছেন। ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে’—নিজের এই অসত্য দাবির পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি পিছু হটেছেন। ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার যে মধ্যবর্তী চুক্তি হলো, তা কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি ছিল সমুদ্রের এক কঠিন বাস্তবতার কূটনৈতিক রূপান্তর।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুএকে হয়তো চিরাচরিত অর্থে কোনো ‘জয়’ বলা যাবে না। তবে এটি ছিল ওয়াশিংটনের যুদ্ধচেষ্টাকে কৌশলগতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করতে পেরেছে, অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু সরকার পতন, ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পুরোপুরি সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়নি।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘অরতেশ’-এর পদাতিক শক্তিতে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কাঠামোর যে অংশকে সুরক্ষিত আকাশের ওপর নির্ভর না করে তৈরি করেছিল—অর্থাৎ তাদের উপকূলীয় নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থা—তা তার সামরিক কার্যকারিতা ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা, দুটোই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, ইতিহাস তা বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে এক মার্কিন কর্নেল হ্যারি জি সামারস জুনিয়র তাঁর উত্তর ভিয়েতনামি প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কিন্তু আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কখনোই হারাতে পারোনি।’
উত্তর ভিয়েতনামের কর্নেল টু এর উত্তর দিয়েছিলেন খুব সংক্ষেপে, ‘কথাটা সত্যি হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতাহীন।’
২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের যেকোনো মূল্যায়নে কথোপকথনটি বড় এক শিক্ষা হয়ে ওঠার কথা। এ কথার পেছনের যুক্তি খুব সহজ, আকাশপথে আপনি কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাচ্ছেন, তা দিয়ে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত হয় না, যদি না আপনি শত্রুর কৌশলগত অবস্থান ও তার মানসিক শক্তিতে ফাটল ধরাতে পারেন।
একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাংকার যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সাত বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরান যখন এমনিতেই ক্লান্ত, ঠিক তখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একাধিক অভিযানের মাধ্যমে—আর্নেস্ট উইল, প্রাইম চ্যান্স, নিম্বল আর্চার এবং সর্বশেষ প্রেয়িং ম্যান্টিস।
ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে এক দিনের অভিযানে মার্কিন বাহিনী মূল ইরানি নৌসম্পদ ও তেল প্ল্যাটফর্মের কমান্ড পোস্টগুলো ধ্বংস করে এক বিরাট জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই জয় এসেছিল এক অভিজ্ঞতাশূন্য, ক্লান্ত ইরানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ এসকর্ট, মাইন অপসারণ ও আক্রমণের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।
সেগুলো ছিল শাসনক্ষমতা বদলানোর মতো বড় উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেকটাই সীমিত এবং এক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিশন।
কিন্তু আজকের পরিস্থিতি মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের নৌশক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একদিকে নিয়মিত নৌবাহিনী ‘নেদাজা’, যারা গভীর সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়; অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘নেদসা’, যারা পারস্য উপসাগরকে এক কঠিন ও অনিশ্চিত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
নেদাজা মূলত একটি প্রথাগত ও মর্যাদার নৌবাহিনী। কিন্তু নেদসা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শত্রু প্রতিরোধ, হয়রানি, ধোঁয়াশা ও কৌশলগত কার্যকারিতার জন্য তৈরি।
প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মতো ভৌগোলিক অবস্থানও এক নিরপেক্ষ ব্যাপার। এটা বন্ধু বা শত্রু, যে কারোর কাজেই লাগতে পারে। কিন্তু কৌশল, কাজের পদ্ধতি, যুদ্ধ উপকরণের অভিযোজন এবং কমান্ড কালচার দিয়ে সেই ভূগোলকে কতটা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। ইরান এ শিক্ষা আকাশের চেয়ে সমুদ্রেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
এগুলো কোনো বিমানবাহী রণতরি নয়। এগুলো হলো সমুদ্রে বসানো একেকটি অদম্য দুর্গ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির কারখানা।
ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভলোদিমির জেলেনস্কিসমুদ্রের দাবার চাল
ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে সমুদ্রের লড়াই স্থলযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া হাতছাড়া হওয়ার পর ইউক্রেন তাদের নৌসম্পদের বড় অংশ হারায়, আর ২০২২ সালের মধ্যে তাদের প্রথাগত কোনো নৌবাহিনীই অবশিষ্ট ছিল না।
তা সত্ত্বেও ইউক্রেন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, বিশেষ অভিযান, ড্রোন বোট এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশকে রাশিয়ার জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করে।
এর ফলাফল শুধু কৌশলগত নয়, ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের সেভাসতোপোল ঘাঁটি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে রাশিয়ার অবাধ নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং ইউক্রেন ওদেসা বন্দর দিয়ে নিজেদের পণ্য রপ্তানি পথ আবার চালু করতে পেরেছে।
মূলত সাগরে সম্পূর্ণ আধিপত্য না থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বড় বড় উদ্দেশ্য—যেমন ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ করা, ওদেসায় চাপ সৃষ্টি করা এবং ক্রিমিয়াকে সুরক্ষিত রাখা—ব্যর্থ করে দিতে পেরেছে।
ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।
পুতিন কি জানেন ইউক্রেন কেন যুদ্ধ করছেইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া হারলেও লাভবান হবেন পুতিনএ থেকে শিক্ষা স্পষ্ট, দুর্বল শক্তির জন্য সমুদ্রকে অবরুদ্ধ করা কেবল এক বিকল্প পথ নয়, এটিই এখন যুদ্ধ জয়ের বড় অস্ত্র। কৃষ্ণসাগরে এই কৌশল ব্যবহার করে ইউক্রেন যেমন এক পরাশক্তিকে রুখে দিয়েছে, ঠিক তেমনি উপসাগরে ইরানও কোনো বড় নৌযুদ্ধ না জিতেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য ইউক্রেন ও ইরানের ঘটনা হুবহু এক নয়। ইউক্রেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে এবং বাণিজ্যপথ সচল রাখতে এসব ব্যবহার করেছে। আর ইরান তা ব্যবহার করেছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে, বিমা মাশুল বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে যে বিমান হামলার একটা বড় আর্থিক মূল্য সমুদ্রেই চোকাতে হবে।
ইরানের এই পথ কোনো প্রথাগত নৌসংগ্রাম নয়; এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নৌ অবরোধের এক চতুর মিশ্রণ।
পরিস্থিতি তাই এক বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইরান হয়তো আকাশে অনেক লড়াইয়ে হেরেছে, কিন্তু সমুদ্রের কারণে তাদের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখালেও সমুদ্রকে অপ্রাসঙ্গিক করতে পারেনি।
ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়েছে, নৌবহর না নিয়েও একটি বিশাল নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। আর ইরান দেখিয়ে দিল, একটি বড় নৌযুদ্ধ না জিতেও কীভাবে এক পরাশক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
ড. ওমর আশুর দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।