গভীর সমুদ্রের চেয়ে মহাকাশ সম্পর্কে কি সত্যিই আমরা বেশি জানি

· Prothom Alo

আকাশ আর সাগরের মধ্যে দারুণ কিছু মিল আছে। দুটিই দেখতে নীল। আর দুটিতেই লুকিয়ে আছে নানা রহস্য। মানুষ চাইলে এই দুই জায়গায় সহজে বেঁচে থাকতে পারে না। অতিরিক্ত চাপ, অক্সিজেনের অভাব কিংবা চরম আবহাওয়ার কারণে এসব জায়গায় মানুষকে সরাসরি না পাঠিয়ে রোবট পাঠানো হয়।

Visit grenadier.co.za for more information.

এত মিল থাকার পরও অনেকেই মহাকাশ আর সাগরকে একে অপরের প্রতিপক্ষ মনে করেন। প্রায়ই বলা হয়, মানুষ নাকি চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহের মাটি সম্পর্কে যতটা জানে, নিজেদের পৃথিবীর সাগরের তলদেশ সম্পর্কে ততটা জানে না। কথাটা কি সত্যি?

মহাকাশ ও সমুদ্রের মানচিত্রের আসল সত্যি

কথাটা কিন্তু অনেকটা সত্যি। চাঁদ, বুধ, শুক্র বা মঙ্গল গ্রহের স্পষ্ট মানচিত্র বিজ্ঞানীদের কাছে আছে। তবে সমুদ্রের তলদেশের তত স্পষ্ট মানচিত্র নেই। মহাকাশের মানচিত্র তৈরির কাজ সমুদ্রের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

১৯০৩ সালে ‘জেনারেল বাথিমেট্রিক চার্ট অব দ্য ওশেনস’ (GEBCO) সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র বানানোর কাজ শুরু করে। তখন মহাকাশ নিয়ে মানুষের ধারণা ছিল অনেক কম। ১৯১২ থেকে ১৯৩১ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা শব্দতরঙ্গ বা ‘সোনার’ (Sonar) প্রযুক্তি দিয়ে পানির নিচের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। সে যুগে মানুষ অন্য কোনো গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের অস্তিত্ব সম্পর্কেও জানত না।

বাথরুমে টুথব্রাশ খোলা অবস্থায় রাখা কি স্বাস্থ্যকর

১৯৮২ সালে সাগরের তলদেশের একটি বৈশ্বিক মানচিত্র প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তত দিনে মহাকাশের মানচিত্র তৈরির কাজ অনেক এগিয়ে যায়। অ্যাপোলো মিশনের তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চাঁদের মানচিত্র তৈরি করে। এরপর ২০২৪ সালে চীনের বিজ্ঞানীরা চাঁদের সবচেয়ে নিখুঁত মানচিত্র প্রকাশ করেন। অন্যদিকে আমাদের সাগরের তলদেশ সম্পর্কে আজকের তথ্যগুলো থেকে বড়জোর একটা প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

তবে খুব কম ব্যক্তি আছেন ভিক্টর ভেসকোভো নামের এক অভিযাত্রীর মতো। তিনি সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর জায়গা মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ডুব দিয়ে ইতিহাস গড়েন। আবার রকেটে করে মহাকাশেও গেছেন। তিনি জানান, পৃথিবীর পাঁচটি মহাসাগরের তলদেশে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। কাজ শুরু করার পর তিনি জানতে পারেন, পাঁচটি মহাসাগরের মধ্যে চারটির তলদেশ ঠিক কোথায় অবস্থিত, সেই সঠিক তথ্যই বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না।

পরবর্তী সময়ে ভেসকোভো ও তাঁর দল নিজেদের অভিযানের এলাকার মানচিত্র তৈরি করে। বর্তমানে তাঁরা ‘সিবেড ২০৩০’ নামে একটি প্রকল্পে কাজ করছেন। তাঁদের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্রের পুরো তলদেশের একটি স্পষ্ট ও আধুনিক মানচিত্র তৈরি করা। সমুদ্রের মানচিত্র বানানোর প্রধান বাধা হলো এর বিশালতা। পুরো সাগরের তলদেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অংশই মানচিত্রের বাইরে রয়ে গেছে। এর আয়তন প্রায় ৩০ কোটি বর্গকিলোমিটার।

তবে বর্তমানে এ কাজের গতি দ্রুত বাড়ছে। ২০১৭ সালেও সমুদ্রের মাত্র ৬ শতাংশ এলাকা আধুনিক মানে মানচিত্রে উঠে এসেছিল। সোনার বা শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে মূলত এসব কাজ করা হচ্ছে। মানুষ বা ক্যামেরা দিয়ে এই বিশাল তলদেশের খুব ছোট একটি অংশই সরাসরি দেখা সম্ভব হয়েছে।

অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ডের চেয়ে কি ২ জন বাস্তব বন্ধু বেশি ভালোমঙ্গল গ্রহ

মহাকাশ কেন এগিয়ে আছে

কোনো কিছু যদি ওপর থেকে খালি চোখে দেখা যায়, তবে তার মানচিত্র বানানো অনেক সহজ। আর এ সুবিধাই পেয়েছে মহাকাশ গবেষণা।

মঙ্গল বা বুধ গ্রহের চারপাশে কৃত্রিম উপগ্রহ ঘুরিয়ে হাজার হাজার ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। তারপর সেই ছবিগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে চমৎকার সব মানচিত্র। মঙ্গল গ্রহের সুবিশাল ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন পিক্সেলের একটি অতিস্পষ্ট ছবি বিজ্ঞানীদের কাছে রয়েছে। যেখানে প্রতি ৫ মিটারের নিখুঁত তথ্য পাওয়া যায়।

এমনকি ঘন মেঘে ঢাকা শুক্র গ্রহের মানচিত্রও রাডার প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক আগেই তৈরি করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। মহাকাশযানগুলো খুব সহজেই কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

সাগরের বেলায়ও একই ধরনের অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানচিত্র তৈরির জন্য স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করছেন গ্রিনওয়াটার ফাউন্ডেশনের গবেষকেরা। এতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে খরচ পড়ছে মাত্র ২ ডলার, যা সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে অন্তত ১০ গুণ কম।

তবে সমুদ্রের সব জায়গায় এই স্যাটেলাইট কাজ করে না। উপকূল থেকে একটু দূরে, যেখানে আলোর গভীরতা পৌঁছায় না, সেখানে অটোমেটিক ড্রোন বোট ব্যবহার করা হচ্ছে।

আর গভীর সমুদ্রের জন্য বিখ্যাত অভিযাত্রী ভিক্টর ভেসকোভো একটি বিশেষ ধরনের আধা স্বয়ংক্রিয় জাহাজের নকশা করছেন। মাত্র ১ বা ২ জন ক্রু নিয়ে এই জাহাজ একটানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ সাগরে অবস্থান করবে। এতে থাকা শক্তিশালী ‘কংসবার্গ ইএম১২৪’ সোনার দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা স্ক্যান করতে পারবে।

চাঁদ কীভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা ঘটায়

অর্থায়ন ও আসল চ্যালেঞ্জ

সমুদ্রতলের সঠিক তথ্য জানার মাধ্যমে পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ুর নানা গোপন হিসাব উন্মোচন করা সম্ভব। কিন্তু এ ধরনের গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া বেশ কঠিন।

সমুদ্রের মানচিত্র সরাসরি কোনো ব্যবসায়িক লাভ দেয় না বলেই হয়তো এখানে বড় বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন। কিন্তু সাধারণ কল্যাণের জন্য এটি খুব দরকার। জাহাজ চলাচলের পথ নিরাপদ করা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের সঠিক মডেল তৈরির জন্য সমুদ্রের এই তথ্যগুলো জানা জরুরি।

আগামী দিনগুলোতে মহাকাশ ও সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রের মানচিত্রই আরও উন্নত হবে। তবে শুধু তলদেশের মানচিত্র বানালেই সমুদ্রকে জানা শেষ হয়ে যায় না।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রের পানির ২০০ মিটারের নিচের অংশের ৯৯ দশমিক ৯৯৯ শতাংশ এলাকা মানুষ এখনো নিজের চোখে দেখেইনি। মানুষের সরাসরি দেখা অঞ্চলটির আয়তন বড়জোর একটি ছোট্ট দেশ বেলজিয়ামের সমান।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্সমঙ্গলের চাঁদ ডিমোসের আকার আলুর মতো কেন

Read full story at source