গাজায় কি সিরিয়া মডেল প্রয়োগ করছে আমেরিকা

· Prothom Alo

মিসরের এল-আলামিন শহরে বন্ধ দরজার ওপাশে মুখোমুখি বসে ছিলেন দুজন মানুষ, যাঁদের একসঙ্গে এক টেবিলে বসার কথা কয়েক বছর আগেও কেউ কল্পনায় আনতে পারত না। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত দূত জ্যারেড কুশনার। অন্যজন হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হাইয়া—যাঁকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একদিন সন্ত্রাসী তালিকায় তুলেছিল।

দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকে পাশে ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, ‘বোর্ড অব পিস’-এর পরিচালক নিকোলে ম্লাদেনভ, মিসরীয় গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রশাদ এবং কাতার-তুরস্কের প্রতিনিধিরা।

Visit h-doctor.club for more information.

২০২৬ সালের ১৬ আগস্টের এই বৈঠক সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকা কি গাজায় সিরিয়ার সেই পুরোনো পরীক্ষাটাই আবার চালাতে চাইছে, যেখানে একদা আল-কায়েদার কমান্ডার আবু মোহাম্মদ আল-জুলানি স্যুট পরে আহমেদ আল-শারা নামে দামেস্কের প্রেসিডেন্ট বনে গেছেন?

হামাস আমেরিকার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠন। অথচ কুশনারের সঙ্গে একই টেবিলে হামাস বসেছে কোনো ভাঙা, নতজানু শক্তি হিসেবে নয়। উল্টো, গত দুই বছরে যে শক্তি একসময় নিজেকে অঞ্চলের অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি ভাবত, সেই ইসরায়েলকেই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে এই যুদ্ধ।

ইসরায়েলের অহং ভেঙে দিয়েছে হামাস

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার লক্ষ্য ছিল হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা। দুই বছর পর সেই লক্ষ্য থেকে ইসরায়েল যতটা দূরে, ততটাই কাছে চলে এসেছে এক অন্য বাস্তবতার—বিশ্বমঞ্চে একঘরে হয়ে পড়ার বাস্তবতা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু যখন ভাষণ দিতে ওঠেন, একের পর এক প্রতিনিধি প্রতিবাদে হল ছেড়ে বেরিয়ে যান। আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার অভিযোগে ইসরায়েলকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তদন্তে নেমেছে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, এমনকি চিরকালের বিশ্বস্ত মিত্র জার্মানিও প্রকাশ্যে যুদ্ধের সমালোচনা করেছে। নেতানিয়াহু নিজেই একবার প্রায় স্বীকার করে ফেলেছিলেন, ইসরায়েলকে এখন একধরনের বদ্ধ, আত্মনির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতে হতে পারে। এরপরই তেল আবিব শেয়ারবাজারে ধস নামে।

হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হাইয়া এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত দূত জ্যারেড কুশনার

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা দেখিয়েছে, শুধু ২০২৩ থেকেই ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভবই হতো না যুক্তরাষ্ট্রের ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সহায়তা ছাড়া। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট এ নিয়ে একাধিকবার ইসরায়েলকে খোঁচাও দিয়েছেন যে আমেরিকার বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আক্রমণ না করে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করা উচিত।

আর এই যুদ্ধ গাজার সীমানায় আটকে থাকেনি। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলা, আর ২০২৫ সালের জুনে সরাসরি ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকেও নিজের বোমারু বিমান পাঠিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে হয়েছে—এই সব ঘটনার সূচনাবিন্দু ছিল ৭ অক্টোবর। একটি অবরুদ্ধ, প্রায় নিরস্ত্র উপত্যকার একটি সংগঠনের হামলা কীভাবে গোটা অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে গেল, আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তিকেও সেই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে ফেলল—এই প্রশ্নটা ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা নিশ্চয়ই গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ করবেন।

তিন দশকের নীরব যোগাযোগ

হামাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগের ইতিহাস অবশ্য নতুন কিছু নয়, শুধু এত দিন সেটা ছিল ছায়ার আড়ালে। আশির দশকের শেষভাগে ও নব্বইয়ের শুরুতে আম্মান আর জেরুজালেমে মার্কিন কূটনীতিকেরা তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনে হামাস প্রতিনিধিদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলতেন। ১৯৯৭ সালে হামাসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় তোলার পর এই সম্পর্ক আইনত বন্ধ হয়ে যায়, আর প্রায় তিন দশক সবকিছু চলে কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায়, পরোক্ষ পথে।

২০২৩ সালের যুদ্ধ এই সমীকরণ খানিকটা পাল্টে দেয়। প্রথম দেড় বছর সব আলোচনা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেই চলছিল। ২০২৫ সালের মার্চে জিম্মি মুক্তির প্রশ্নে দোহায় প্রথমবারের মতো মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হামাসের অনানুষ্ঠানিক সরাসরি যোগাযোগ ঘটে, আর গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সেই যোগাযোগ ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে থাকে।

এল-আলামিনের বৈঠক তারই চূড়ান্ত রূপ, যুদ্ধবিরতির পর হামাস নেতৃত্বের সঙ্গে কুশনারের এটাই প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।

হামাস কি তাহলে শেষ হয়ে গেল?হামাস কেন গাজায় সরকার থেকে সরছে, নেপথ্যে কী?

কেন খলিল আল-হাইয়াকে বেছে নেওয়া হলো

বলা হয়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে আজ খলিল আল-হাইয়া বসছেন, কারণ তার আগে যাঁদের বসার কথা ছিল, তাঁরা আর নেই। ৭ অক্টোবরের মূল রূপকার ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজার সুড়ঙ্গে এমন গোপনীয়তায় থাকতেন যে তাঁর সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদানই ছিল প্রায় অসম্ভব; ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি নিহত হন। তার আগে জুলাইয়ে তেহরানে খুন হন তুলনামূলক মধ্যপন্থী ও আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য মুখ ইসমাইল হানিয়া।

প্রবাসী নেতৃত্বের প্রধান মুখ খালেদ মেশাল সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আসাদবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় ইরান-হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই, আর গাজার ভেতরের মাঠপর্যায়ের কমান্ডের ওপর তাঁর প্রভাবও সীমিত।

এই শূন্যতায় সিনওয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আল-হাইয়া হয়ে ওঠেন প্রায় অনিবার্য এক যোগসূত্র। গাজার প্রতিরোধযোদ্ধাদের ওপর যাঁর বাস্তব কর্তৃত্ব আছে, আবার কাতার-মিসরের মধ্যস্থতাকারীদের কাছে যিনি বহুদিন ধরে পরিচিত এক বাস্তববাদী আলোচক হিসেবে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪

সিরিয়ার মডেল কতটা কার্যকর

আল-শারার গল্পটা তো এখন কিংবদন্তির মতো। আল-কায়েদার ছায়া থেকে বেরিয়ে হায়াত তাহরির আল-শাম নামের সশস্ত্র সংগঠনকে তিনি প্রশাসনিক কাঠামোয় বদলে ফেলেছেন, দামেস্কে ক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছেন, এমনকি ওয়াশিংটন থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তও আদায় করে নিয়েছেন।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুশনার এল-আলামিনে সরাসরি হামাস নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন, অস্ত্র সমর্পণে বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া ইসরায়েলের কাছ থেকে কোনো ছাড় মিলবে না, শাসনভার যেতে হবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে, আর ভবিষ্যৎ গাজা প্রশাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা রাখা যাবে না। এর সঙ্গে যোগ হয় তেহরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ থেকে বেরিয়ে মিসর-কাতার-তুরস্কের কক্ষপথে ঢুকে পড়ার শর্ত।

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ নিয়ে লেখা ‘হামাস কনটেইনড’ গ্রন্থের লেখক তারেক বাকোনি তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে হামাসকে ধ্বংস করার বদলে তাদের একটা সীমার মধ্যে বেঁধে রাখার, অর্থাৎ কনটেইনমেন্টের কৌশল নিয়েছিল, আর ৭ অক্টোবর আসলে সেই ১৬ বছরের অবরুদ্ধ ভারসাম্যকেই ভেঙে দিয়েছে।

হামাস যেভাবে ইসরায়েলের ‘অপরাজেয়তার মিথ’ ভেঙে দিল‘হামাস আমার মা-বাবাকে হত্যা করেছে, তবুও আমি এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে’

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের চার্লস লিস্টার এবং দোহা ইনস্টিটিউটের গবেষক মাহজুব জুয়েরির যুক্তিও কাছাকাছি। পশ্চিমা শক্তিগুলো যখন কোনো সশস্ত্র আন্দোলনকে সামরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে ব্যর্থ হয়, তখন শেষমেশ তাকে রাজনৈতিক কাঠামোয় আটকে রাখার পথ বেছে নেয়। সিরিয়ায় যা আল-শারার মাধ্যমে ঘটেছে, গাজায় তারই একটা রূপ ঘটানোর চেষ্টা চলতে পারে।

ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশ্লেষক আদেল শাদিদের যুক্তি হলো, ওয়াশিংটন এখন হামাসকে সমস্যার উৎস হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সমাধানের একটা অনিবার্য অংশ হিসেবে দেখছে।

যদিও সিরিয়ায় আল-শারার লড়াই ছিল একটা প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, যেখানে ক্ষমতা দখলের পর অস্ত্র রাখা না-রাখা তার নিজের সিদ্ধান্তের বিষয় ছিল, তিনি জয়ী হয়ে নিজের শর্তে আপস করেছেন। হামাসের প্রশ্নটা একেবারে ভিন্ন। তাদের রাজনৈতিক বৈধতা দাঁড়িয়ে আছে দখলদারির বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধের ওপর, একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডহীন অবরুদ্ধ উপত্যকায়, যেখানে দখলদার বাহিনী এখনো ফিলাডেলফি ও নেতজারিম করিডরে বসে আছে। এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্র সমর্পণের মানে হামাসের কাছে শুধু কৌশলগত পরাজয় নয়, এটা তাদের পুরো রাজনৈতিক অস্তিত্বের ভিত্তিকেই অস্বীকার করে বসা।

ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে

যে সংশয় নিয়ে ইসরায়েল নিজেই দ্বিধায়

আরও কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, এই তুলনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সন্দিহান খোদ ইসরায়েলিরাই। ইসরায়েলের এক মন্ত্রী সম্প্রতি প্রকাশ্যেই আল-শারাকে সিনওয়ারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, সিরিয়া এখন আরেকটা গাজা হয়ে ওঠার পথে আছে, বরং অনেক বেশি শক্তিশালী রূপে।

তাদের যুক্তি হলো, হামাসও একদা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিল, তারপর গাজাকে বদলে দিয়েছিল সশস্ত্র ঘাঁটিতে; হিজবুল্লাহও লেবাননের রাজনীতিতে ঢুকে একই সঙ্গে গড়ে তুলেছিল ক্ষেপণাস্ত্রের সাম্রাজ্য। স্যুট পরা আর মধ্যপন্থার ভাষায় কথা বলাটা যে সত্যিকারের রূপান্তরের প্রমাণ নয়, সেই ইতিহাস ইসরায়েল একাধিকবার নিজের চোখে দেখেছে বলেই তাদের সংশয় এত বেশি।

ফলে যে যুক্তিতে ওয়াশিংটন হামাসকে সিরিয়া মডেলে বদলাতে চাইছে, ঠিক সেই যুক্তিতেই ইসরায়েলের একাংশ সিরিয়াকে দ্বিতীয় গাজা হয়ে ওঠার আশঙ্কায় ভুগছে।

যে চাপে এগোতে বাধ্য হচ্ছে ওয়াশিংটন

এই তৎপরতার পেছনে আছে আরও বড় হিসাব-নিকাশ। সৌদি আরব বহুবার স্পষ্ট করেছে, গাজায় বিশ্বাসযোগ্য যুদ্ধবিরতি আর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রোডম্যাপ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে তারা যাবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির কেন্দ্রে এখনো সেই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের অনুমোদিত ১৫ দফা রোডম্যাপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররাও। মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব—এই আট মুসলিম দেশ যৌথ বিবৃতিতে নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যানকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বপ্নের ওপর সরাসরি আঘাত বলে আখ্যা দিয়েছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি সংকট এবং একই সঙ্গে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা বৈশ্বিক বাণিজ্য করিডরকে অস্থির করে রাখায় মধ্যপ্রাচ্যের সম্মিলিত চাপ উপেক্ষা করার সাধ্য ওয়াশিংটনের সীমিত হয়ে এসেছে।

আবার ইরানও সহজে তার সবচেয়ে সম্মুখ ফ্রন্ট ছাড়ছে না। হামাসকে নিরস্ত্র করা মানে তেহরানের জন্য ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বড় পরাজয়, তাই কূটনৈতিক ও লজিস্টিক চ্যানেলে তাদের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা চলবেই।

সবচেয়ে বড় দেয়াল অবশ্য দাঁড়িয়ে আছে তেল আবিবে। নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী জোট সরকার আর ইসরায়েলি সামরিক প্রতিষ্ঠান দুই-ই ফিলাডেলফি ও নেতজারিম করিডর থেকে সেনা প্রত্যাহারে অনিচ্ছুক।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করেছে ত্রাণবাহী ট্রাক। ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে

শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে

সিরিয়া মডেলের হুবহু প্রয়োগ গাজায় সম্ভব নয়, কারণ সিরিয়ার মতো কোনো কেন্দ্রীয় সার্বভৌম রাষ্ট্রকাঠামোই গাজায় নেই। হামাসের পূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তর যেমন ঘটার সম্ভাবনা কম, তেমনি তাদের সম্পূর্ণ সামরিক বিলুপ্তিও বাস্তবসম্মত নয়। দুই বছরের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, শক্তি দিয়ে হামাসকে মুছে ফেলা যায়নি, বরং তারা এখনো আমেরিকার সঙ্গে টেবিলে বসার মতো একটা অবস্থান ধরে রেখেছে।

ওদিকে রামাল্লার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও ফাতাহকে পাশ কাটিয়ে কোনো টেকনোক্র্যাট প্রশাসন গাজায় বসানোও বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। ফলে সাম্প্রতিক জাতীয় সমঝোতা প্রক্রিয়াগুলোতে যে ফিলিস্তিনি ঐক্যের তাগিদও দেখা গেছে।

যা ঘটার সম্ভাবনা বেশি, তা হলো এক অস্বস্তিকর মধ্যবর্তী বন্দোবস্ত। হামাস সরাসরি শাসনের সামনের সারিতে না থেকে শাসনভার তুলে দেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক টেকনোক্র্যাট কাউন্সিলের হাতে, কিন্তু পর্দার আড়ালে ফিলিস্তিনি রাজনীতির একটা নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে থেকেই যাবে। ওয়াশিংটনকে হয়তো নিজের বৃহত্তর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে এই অস্বস্তিকর বাস্তবতা মেনে নিয়েই যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার পথ চলতে হবে।

  • মনযূরুল হক জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, ধর্ম বিভাগ, প্রথম আলো

Read full story at source