কেয়াবন ও নারকেলগাছ কেটে সেন্ট মার্টিনে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট

· Prothom Alo

প্রতিবেশ সংকটাপন্ন প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে নতুন করে গড়ে উঠছে অন্তত ১২টি রিসোর্ট–কটেজ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর এসব রিসোর্ট–কটেজের নির্মাণকাজ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও দ্বীপের বাসিন্দারা। অথচ এ দ্বীপে সব ধরনের স্থাপনা তৈরি নিষিদ্ধ।

Visit rouesnews.click for more information.

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দ্বীপে নতুন করে ৭০টির বেশি রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা–জরিমানাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রশাসনের পদক্ষেপে তখন নতুন রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়।

সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়ার পর বৈরী আবহাওয়ার সময় যখন টেকনাফের সঙ্গে দ্বীপের নৌ যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকে, তখনই বাড়ে নির্মাণকাজ। কেয়াবন ও নারকেলগাছ কেটে নতুন স্থাপনা নির্মাণ, সৈকত থেকে বালু ও চুনাপাথর তুলে ব্যবহার এবং অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। দুই বছর আগে পর্যটক সীমিত করার পর দ্বীপের প্রকৃতিতে কিছুটা প্রাণও ফিরেছিল। কিন্তু একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের কারণে সেই ইতিবাচক পরিবর্তন আবার হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে সেন্ট মার্টিনে ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে নির্মিত এবং বর্তমানে চলমান স্থাপনাগুলো যোগ হলে সংখ্যাটি ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে। এদিকে সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে অবৈধ নির্মাণ চলতে থাকলে সেই প্রকল্প কতটা কার্যকর ফল দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন পরিদর্শন করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। অবৈধ রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণ বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে প্রতিমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব অপরিকল্পিত হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের জন্য হুমকি। আমি পরিদর্শনে গিয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’

শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। অপরিকল্পিত হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের জন্য হুমকি। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্মাণসামগ্রী দ্বীপে নেওয়ার ওপর কড়াকড়ি থাকলেও নানা কায়দায় পৌঁছে যাচ্ছে ইট, বালু, রড ও সিমেন্ট। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে টেকনাফ থেকে নেওয়া নির্মাণসামগ্রীর একটি অংশ হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণে ব্যবহৃত বা বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেশির ভাগ রিসোর্ট-কটেজের মালিক কক্সবাজারের বাইরের জেলার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও আছেন। আর দ্বীপে নির্মাণকাজ তদারকি, শ্রমিক সরবরাহ ও নির্মাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত আছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একসময় দ্বীপটিতে প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য ছিল। প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস ছিল এটি। গত দুই দশকে প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে।

এখন পরিবেশ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রসৈকত ও সংলগ্ন বালিয়াড়িতে নতুন করে কেয়াবন সৃজন ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এ জন্য কেয়াগাছের ফল সংগ্রহ করে চারা তৈরি করা হচ্ছে। কেয়াবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে দ্বীপকে রক্ষার পাশাপাশি বালু ধরে রাখতে সহায়তা করে। প্রকল্পের আওতায় প্রবাল, সামুদ্রিক শৈবাল, লাল কাঁকড়া ও পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল রক্ষা, প্যারাবন সৃজন এবং সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরির কাজও চলছে। কাছিমের ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটিয়ে সমুদ্রে অবমুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।

রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণের নেপথ্যে রাজনৈতিক নেতারা

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা চুনাপাথর, শামুক–ঝিনুক ও প্রবাল-শৈবাল আহরণ বন্ধ করা হয়। পাশাপাশি সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হলেও অবৈধ নির্মাণ বন্ধ হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করে অন্তর্বর্তী সরকার। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিদিন দুই হাজার পর্যটক দ্বীপটিতে যাওয়ার সুযোগ পান। বছরের বাকি সময় দ্বীপটি প্রায় পর্যটকশূন্য থাকে। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকের কম। এতে পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হলেও কেয়াবন রক্ষা করা যাচ্ছে না। এখন চলছে নতুন করে রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণ।

প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক ৮ ও ৯ আগস্ট পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে সেন্ট মার্টিনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। উত্তর পাড়ায় একটি, দক্ষিণ পাড়ায় দুটি, পূর্ব পাড়ায় দুটি, গলাচিপায় চারটি ও কোনারপাড়ায় তিনটি নতুন রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণের দৃশ্য দেখা গেছে। কোথাও ভবনের ছাদ ঢালাই চলছে, কোথাও পিলার তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও টিন ও ইটের দেয়াল দিয়ে তৈরি হচ্ছে একের পর এক কটেজ। এসব স্থাপনা নির্মাণের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় সৈকতের বালু ও মূল্যবান চুনাপাথর। উজাড় করা হচ্ছে কেয়াবন। এতে দ্বীপের পরিবেশে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের বলতে শুনেছি যে কাঁকড়া আর কাছিমের চেয়ে মানুষের চাহিদার বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এমন দর্শন সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর পথে বড় বাধা।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের গলাচিপা এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় ‘মেরিন পার্ক’। সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের উত্তর পাশে টিনের ঘেরা দিয়ে ভেতরে চলছে ‘স্যান্ডি বিচ রিসোর্ট’–এর নির্মাণকাজ। এক পাশে দ্বিতল ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে, অন্য পাশে ইট-সিমেন্ট ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ১০টি কটেজ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শ্রমিক বলেন, এই রিসোর্টের মালিক ঢাকার প্রভাবশালী নেতা। তাঁর পক্ষে নির্মাণকাজ তদারক করেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুর রহমান ও তাঁর ভাতিজা বিএনপি কর্মী মো. আয়াছ। রিসোর্ট তৈরির ইট, বালু ও সিমেন্ট সরবরাহ দিচ্ছেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক জিয়াবুল হক।

মো. আয়াছ প্রথম আলোকে বলেন, এই রিসোর্টের মালিক ইমতিয়াজ নামে ঢাকার এক ব্যক্তি। তাঁরা ইমতিয়াজের কাজ দেখাশোনা করছেন এবং শ্রমিক সরবরাহ করেন। নির্মাণকাজে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড সরবরাহ করছেন ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল, ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামসহ কয়েকজন। ইট–বালু, সিমেন্ট–রড কোথা থেকে আনা হয়, তা তিনি জানেন না।

আয়াছ জানান, জিয়াবুল হক মেরিন পার্কের দক্ষিণ দিকে আরেকটি রিসোর্ট নির্মাণ করছেন। তাঁর কাছে জেনে মেরিন পার্ক থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে গিয়ে রাস্তার পাশে পাওয়া যায় নির্মাণাধীন রিসোর্টটি। রাস্তার পাশে তৈরি করা হয়েছে লাল টিন ও ইটের দেয়াল দিয়ে চারটি কটেজ। পাশে আরও ছয়টি কটেজ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। ৩০-৩৫ জন শ্রমিক পাশের সৈকত থেকে বালু তুলে বস্তায় ভরে জমি ভরাট করছেন।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ পাড়ায় আইন উপেক্ষা করে নির্মিত হচ্ছে ‘ইউএনও রিসোর্ট’। গত ৯ আগস্ট সকালে

নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা জানান, এই রিসোর্টের মালিক ফরিদপুরের একজন সাবেক সংসদ সদস্য। তবে তাঁর নাম তাঁরা জানেন না। তাঁর পক্ষে নির্মাণকাজের দেখভাল করছেন যুবদল নেতা জিয়াবুল হক ও তাঁর বড় ভাই ইসহাক মাহমুদ চৌধুরী।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আবদুর রহমান ও জিয়াবুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বাড়িতে গিয়েও তাঁদের পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা সাড়া দেননি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সেন্ট মার্টিন কার্যালয়ের অধীন চলমান প্রকল্প দেখাশোনা করেন পরিবেশকর্মী আবদুল আজিজ। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় কর্মকর্তারা সেখানে যেতে পারছেন না।

দ্বীপের দক্ষিণাংশে দিয়ারমাথা এলাকায় সবুজ টিনের ঘেরাও দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে আরেকটি কটেজ। পরিচিতি ফলক না থাকলেও এলাকার মানুষ এটিকে ‘ইউএনও কটেজ’ নামে চেনেন। টেকনাফের সাবেক একজন ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) এই জমি কিনেছেন বলে এলাকায় আলোচনা আছে। তবে এই ইউএনওর নাম জানাতে পারেননি শ্রমিকেরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, এই কটেজের ১৬টি পিলার নির্মাণ করা হচ্ছে। সৈকত থেকে বালু ও চুনাপাথর তুলে এনে সেখানে মজুত করা হচ্ছে। এই কটেজ নির্মাণের তদারকির দায়িত্বে ছিলেন দ্বীপের প্রভাবশালী ব্যক্তি আবদুল শুক্কুর। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে বাদ দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় যুবদল নেতা জিয়াবুল হককে। শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট–বালু, সিমেন্ট-রড জিয়াবুল নিজেই কিনে আনেন।

দ্বীপের মধ্যভাগে নির্মাণ হচ্ছে আরেকটি রিসোর্ট ‘দ্য লাস্ট ওয়েভ’। জোয়ারের পানিতে রিসোর্টের পশ্চিম পাশের জমি বিলীন হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকেরা সৈকত খুঁড়ে বালু তুলে বস্তায় ভরে রিসোর্টের প্রতিরক্ষা বাঁধ দিচ্ছেন। ভেতরে নির্মাণ হচ্ছে সাতটি কটেজ। একজন শ্রমিক জানান, আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটন মৌসুম শুরু হবে। এর আগেই নির্মাণকাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম সৈকতে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্র বিলাসের পেছনে ‘সিসিটিভি রিসোর্ট’। তার কিছুটা উত্তরে কয়েকটি নারকেলগাছ কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে আরেকটি রিসোর্ট। ‘সান অ্যান্ড বিচ রিসোর্ট’ নামের ভবনটির একতলার ছাদ ঢালাই হয়েছে, দ্বিতীয় তলার পিলার তোলার কাজ চলছে। এই রিসোর্টের মালিক ঢাকার এক ব্যক্তি। এটির নির্মাণকাজের তদারক করছেন আরেক বিএনপি নেতা আবদুর রহমান ও কর্মী মো. আয়াছ। আবদুর রহমান বলেন, সবাই যেভাবে ম্যানেজ করে রিসোর্ট বানাচ্ছেন, তাঁরাও সেভাবে করছেন। তবে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের যুক্ত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেননি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আলমগীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যুবদলের আহ্বায়ক জিয়াবুল হক, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শাকিলসহ বিএনপির কয়েকজন নেতার ছত্রচ্ছায়ায় ঢাকার প্রভাবশালী লোকজন এই দ্বীপে রিসোর্ট-কটেজগুলো নির্মাণ করছেন। বিএনপি ও যুবদল নেতারা নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করছেন। এমন কাজে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আর জমি ভরাট ও পিলার নির্মাণে সৈকতের বালু ও চুনাপাথর ব্যবহার করা হচ্ছে।

রিসোর্ট রক্ষায় সৈকতের বালু তুলে দেওয়া বাঁধ। ৮ আগস্ট সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম পাড়ায়

ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের তিন নেতা দ্বীপের স্থাপনা নির্মাণকাজে সহযোগিতা করছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আনা নির্মাণসামগ্রী রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণ করা হলেও তার জন্য কোনো অনুমতি দেওয়া হয় না বলে জানান সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজুল ইসলাম। তিনি বলেন, যেসব কটেজ-রিসোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে সব কটি অবৈধ। নির্মাণের পর মালিকেরা ব্যবসা পরিচালনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আসেন, কিন্তু তিনি দিচ্ছেন না।

প্রকল্পের ইট-বালু যাচ্ছে কোথায়

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) লিখিত অনুমতি ছাড়া টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে গৃহনির্মাণসামগ্রী নেওয়া যায় না। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এই বিধিনিষেধের মধ্যেও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের নামে টেকনাফ থেকে ট্রলারে আনা নির্মাণসামগ্রীর একটি অংশ হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

৪ নম্বর ওয়ার্ডের রোকসানা রিসোর্ট গেট থেকে মহিলা মাদ্রাসা পর্যন্ত সড়কের গাইডওয়াল ও আরসিসি ঢালাই প্রকল্পের জন্য গত ১৬ জুন টেকনাফ থেকে আনা হয় ২ হাজার ইট, ২০ বস্তা সিমেন্ট ও বিপুল পরিমাণ বালু। ১৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য মো. আল নোমান বলেন, মালামাল তাঁর হেফাজতে রয়েছে। বর্ষা ও জলাবদ্ধতার কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে।

২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর পাড়া এলাকায় আরেকটি গাইডওয়াল ও আরসিসি ঢালাই প্রকল্পের জন্য ৭ জুলাই আনা হয় ২ হাজার ৫০০ ইট, ১৩০ ফুট খোয়া, ৩৫ ব্যাগ সিমেন্ট, ২০০ ফুট বালু ও ১৫০ কেজি রড। ৯ আগস্ট প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কাজের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য মাহফুজা আক্তার বলেন, বৃষ্টির কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। নির্মাণসামগ্রী গুদামে রাখা আছে। তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের পাশে পাকা ভবন হচ্ছে। কটেজ-রিসোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে দ্বীপের অন্যান্য এলাকায়ও। সবাই দেখছে, শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর দেখছে না। চোখের সামনে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজুল ইসলামসহ আরও দুজন ইউপি সদস্যের নামে উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে সম্প্রতি ইট–সিমেন্ট, রড, খোয়া ও বালু দ্বীপে আনা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি তেমন নেই।

স্থানীয় বিএনপির সভাপতি নুরুল আলমের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ইউএনওর অনুমতি নিয়ে টেকনাফ থেকে ট্রলারে আনা নির্মাণসামগ্রীর কিছু অংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এটি নিয়ে তদন্ত করা উচিত।

অবশ্য সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হোটেল-রিসোর্টের মালিকের কাছে প্রকল্পের ইট–সিমেন্ট, রড বিক্রির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

টেকনাফের ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সেন্ট মার্টিনে কারা হোটেল, রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণ করছে, তা দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। সেন্ট মার্টিনে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, সব কটিতে কী পরিমাণ ইট, সিমেন্ট, রড, বালু লাগবে তার প্রাক্কলন করা আছে। সে হিসাবে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কোথাও মালামাল বিক্রি করে দিলে কিংবা কাজ না করলে তদন্তে ধরা পড়বে, তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নতুনগুলো ছাড়াও দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে আগে নির্মিত রিসোর্ট–কটেজে চলছে সংস্কারকাজ। কোনারপাড়াতে ট্রফিকানা বিচ রিসোর্ট, গলাচিপার জলকুটি রিসোর্ট, দক্ষিণা হাওয়া রিসোর্ট, আরণ্যক ইকো রিসোর্ট, ফ্যান্টাসি হোটেল, ডেইলপাড়ার ইউরো বাংলা রিসোর্ট, হোটেল ফ্যান্টাসি, হোটেল সি প্রবাল, লাবিবা আটলান্টিক রিসোর্ট, সান রাইজ রিসোর্ট, শতাব্দী ইকোসহ অন্তত ১৬টি রিসোর্টে গিয়ে দেখা গেছে, নির্মাণকাজে সৈকতের প্রাকৃতিক চুনাপাথর, কোরাল পাথর ও বালু ব্যবহার হয়েছে।

তিনটি রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘাটে ঘাটে ম্যানেজ’ করেই এসব অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড সরবরাহ করেন। পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বৈরী আবহাওয়ার সময় দ্বীপের সঙ্গে টেকনাফের নৌ যোগাযোগ সীমিত থাকার সুযোগও কাজে লাগানো হচ্ছে। এ সময় সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কম থাকায় নির্মাণকাজ অবাধে চলে।

সেন্ট মার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের করা মামলার তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই করেন। ফলে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় হোটেল-রিসোর্ট তৈরি হলেও পুলিশের সরাসরি করার খুব বেশি কিছু থাকে না। পুরো দ্বীপের জন্য ফাঁড়িতে পুলিশ সদস্যও মাত্র চারজন।

মামলা-জরিমানা, তবু থামছে না কাজ

২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে সেন্ট মার্টিনে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জলজ প্রাণী সংরক্ষণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

২০১৭ সালে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধভাবে তৈরি ৩৮টি হোটেল ভেঙে ফেলার নোটিশ দেয়। তখন দ্বীপে ১০৪টি আবাসিক হোটেল-মোটেল ও কটেজ থাকার তথ্য দিয়েছিল সংস্থাটি। এর কোনোটিরই পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল না।

এরপর অভিযান চালিয়ে অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনটি হোটেলকে জরিমানা এবং একটি কটেজের নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছিল। গত পর্যটন মৌসুমে গাছ কাটা, সৈকত ও বালিয়াড়ি দখল, বালু ও কোরাল পাথর আহরণ এবং উচ্চ শব্দে জেনারেটর চালানোর অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। একটি নির্মাণাধীন রিসোর্ট থেকে ১ হাজার কেজি কোরাল পাথর ও ১০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর পাঁচ বছরে টেকনাফ থানায় করা আট মামলায় ৩১টি রিসোর্টের মালিক-ব্যবস্থাপকের নাম উল্লেখ করে আরও ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করেছে। এর আগে দুই বছরে পর্যটন মৌসুমের ৯ মাসে অবৈধভাবে নির্মিত ৭২টি রিসোর্ট-কটেজের মালিকের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চালিয়ে ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। তবে আইনি জটিলতা ও আপিল মামলার কারণে বেশির ভাগ অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

সেন্ট মার্টিন সৈকতে ডিম পাড়তে আসা কাছিমের সংখ্যা তিন গুণ হলো যেভাবে

‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’-এর পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে প্রকল্পের কাজ সামলাতে হচ্ছে। অবৈধ নির্মাণ, বালু ও পাথর উত্তোলনের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেন্ট মার্টিনের নৌ যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এই সুযোগে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণ হচ্ছে। ১ নভেম্বর পর্যটন মৌসুম শুরু হলে কর্মকর্তারা দ্বীপে গিয়ে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।

যোগাযোগ করা হলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুঃখের বিষয় হলো, নির্বাচনের সময় আমরা প্রার্থীদের বলতে শুনেছি যে কাঁকড়া আর কাছিমের চেয়ে মানুষের চাহিদার বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এমন দর্শন সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর পথে বড় বাধা। তাই বহিরাগতদের অশুভ অর্থনৈতিক থাবা থেকে এই দ্বীপকে বাঁচাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সরকারের কঠোর অবস্থান ও নির্দেশনা।’

রিজওয়ানা হাসান বলেন, সেন্ট মার্টিন রক্ষা করতে হলে অবশ্যই প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দিতে হবে। আদালতের আদেশ মেনে এসব অবৈধ হোটেল-মোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসন সহযোগিতা না করলে পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে না।

সাদা বালুর সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কত শিশু স্কুলে যায়, লেখাপড়ার ভবিষ্যৎই–বা কী

Read full story at source