মুর্শিদাবাদে বাবা ও তিন ছেলেকে আটকের পর বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে, দাবি মানবাধিকার সংস্থার
· Prothom Alo

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের মুর্শিদাবাদের সুতি এলাকার একটি ঘটনা রাজ্য পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মপদ্ধতি নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠেছে। সীমান্ত এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর তরফে গত বৃহস্পতিবার বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।
‘মাসুম’–এর তরফ থেকে বলা হচ্ছে, গত ১৩ আগস্ট সুতি থানার উমরাপুর পঞ্চায়েতের বালিয়াঘাটি গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ্ব ডাবলু শেখ এবং তাঁর তিন ছেলে কায়েম শেখ, রাজাউল শেখ ও ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসমাউল শেখকে পুলিশ কোনো প্রকার আগাম তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক করে। শেখ পরিবারের দাবি ও নথিপত্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়। ওই পরিবারের প্রধান ডাবলু শেখ ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাগরিক এবং চলতি বছরও তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এমনকি তাঁর বাবা শেখ সামজানির নাম ১৯৬৬ সালের ভারতের নির্বাচনী রেকর্ডে রয়েছে। পরিবারটির কাছে আধার ও রেশন কার্ডের মতো যাবতীয় বৈধ ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
Visit extonnews.click for more information.
এই পুরো ঘটনার পেছনে কোনো বৈধ আইনি অনুসন্ধান ছিল না বলেই মানবাধিকার সংগঠনের দাবি। সন্দেহজনক নাগরিকত্বের নামে কেবল বাংলাভাষী, দরিদ্র বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়া আইনত ও সংবিধানগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি।
রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের যেভাবে গণহারে হেনস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা তীব্র উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও বিভিন্ন স্থানে বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্য করে প্রশাসনিক ও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তাঁদের গায়ে ‘বিদেশি’র তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কোনো নাগরিককে তাঁর আইনি অধিকার রক্ষা ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই সীমান্ত পার করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মূলত সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচকে অস্বীকার করার শামিল। যে পরিবারগুলোর স্বজনদের এভাবে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন—প্রিয়জন আদৌ বেঁচে আছেন, নাকি ভিনদেশের কোনো কারাগারে বন্দী, সে খবরও পরিবারগুলো পাচ্ছে না।
এই অমানবিক পরিস্থিতি ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ‘মাসুম’ ও ‘প্যাকটি’ রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে সরাসরি পদক্ষেপের দাবি তুলেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যদি কোনো রকম নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্ত ছাড়াই ওই চারজনকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে অবিলম্বে ডাবলু শেখ ও তাঁর তিন সন্তানকে নিরাপদে ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এই পুরো আটক ও সীমান্ত পার করে দেওয়ার বেআইনি ঘটনার পেছনে কাদের ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও সময়সীমাভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখা হয়েছে। পুলিশের অনুসন্ধান প্রতিবেদন, এফআরআরওর নির্দেশপত্র, বিএসএফকে হস্তান্তরের দলিল এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগসংক্রান্ত সব রেকর্ড সর্বসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি সুতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জঙ্গিপুর জেলার পুলিশ সুপার এবং জড়িত অন্যান্য ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত করে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো ভারতীয় নাগরিককে বেআইনিভাবে আটক বা বিতাড়িত করার পেছনে যেসব সরকারি কর্মকর্তা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। সবশেষে ডাবলু শেখ ও তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোটার তালিকা এবং অন্যান্য দেওয়ানি নথিপত্র নতুন করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।