যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কমছে না দাম
· Prothom Alo

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এড়িয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প উপায়ে তেল রপ্তানি বাড়াচ্ছে। ফলে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাক থেকে সেপ্টেম্বর মাসে গড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটাই সর্বোচ্চ। যুদ্ধ শুরুর আগের ১২ মাসে এসব দেশ থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল রপ্তানি হতো, সেপ্টেম্বরে তার ৮০ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়েছে।
Visit tr-sport.bond for more information.
তেল রপ্তানি বৃদ্ধির যেমন অর্থনৈতিক প্রভাব আছে, তেমনি ভূরাজনৈতিক প্রভাব আছে। বিষয়টা হলো, তেল সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তির আলোচনায় ইরানের প্রভাব কমতে পারে। অর্থাৎ তারা এত দিন যে সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল, সেই জায়গাটা তারা কিছুটা হলেও হারিয়েছে। কারণটা খুব স্পষ্ট, সেটা হলো, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বাড়তে থাকলে দ্রুত চুক্তি করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমে যাবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ড্রুরির বিশ্লেষক আনশিকা প্রজাপতি বলেন, ‘কয়েক মাসের ব্যাহত হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে—রপ্তানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।’ তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালিতে শাটল সার্ভিসের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া তেল রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তবে তেল রপ্তানি বাড়লেও বিশ্ববাজারে দাম কমেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আগস্টের শেষে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলার ছিল। এখন তা ১০০ ডলারের ওপরে। অবশ্য এপ্রিল মাসে যুদ্ধের সময় দাম ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল উৎপাদনকারীরা এখন হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তারা যেটা করছে, সেটা হলো উপসাগরীয় বন্দর থেকে তেল নিয়ে প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ জাহাজে তুলে দেওয়া। উপসাগরের ভেতরের বন্দর থেকে যেসব জাহাজ তেল নিয়ে যাচ্ছে, তাদের আর হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে হচ্ছে না।
জাহাজমালিকদের সংগঠন বিমকোর প্রধান শিপিং বিশ্লেষক নিলস রাসমুসেন বলেন, ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ঝুঁকি নিতে রাজি—এমন জাহাজের ওপর নির্ভর না করেই তেল রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবও হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে। এ জন্য দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করছে।
তবে ১০ সেপ্টেম্বর এই পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি আরব তেল সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। তখন দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বাড়ায়। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উপসাগরীয় উপকূলের রাস তানুরা বন্দর দিয়ে যে পরিমাণ তেল পাঠানো হচ্ছে, তা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।
পরবর্তীকালে সৌদি আরব পাইপলাইনের কিছু কার্যক্রম পুনরায় চালু করে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকেও এ মাসে তেল রপ্তানি বেড়েছে। কেপলারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সব মিলিয়ে সৌদি আরবের দৈনিক তেল রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৬৯ লাখ ব্যারেলে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন থেকেও তেল রপ্তানি বেড়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলাচল করা জাহাজের আরও তথ্য পাওয়া গেলে হয়তো দেখা যাবে, প্রকৃতপক্ষে তেল রপ্তানি হয়েছে আরও বেশি। কেননা, অনেক জাহাজ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলের সময় ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে। ফলে এসব জাহাজ চলাচলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলেও শাটল সার্ভিস ও জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল স্থানান্তর অব্যাহত আছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী চারটি জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার রাতে এক তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ছিল কুয়েতের সুপারট্যাংকার আল ফুনতাস। গত তিন মাসে এই জাহাজ একাধিকবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। কুয়েতের বুরগান তেলক্ষেত্র থেকে তেল নিয়ে জাহাজটি আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে তেল পৌঁছে দিয়েছে।
ইউকেএমটিও বলেছে, গত সাত দিনে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথের নিরাপত্তা সহায়তায় প্রতিদিন গড়ে ৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। এসব জাহাজের বেশির ভাগই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার।
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা অন্তত ১৯টি জাহাজকে তারা লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এর মধ্যে সোমবার রাতেই ছিল সাতটি জাহাজ। সেদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তি প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে আইআরজিসির এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সুপারট্যাংকারের ভাড়া গত সপ্তাহে রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। ট্যাংকারের ভাড়া প্রতিদিন ১২ লাখ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যেতে পারে—এমন যেকোনো জাহাজের চাহিদা আকাশচুম্বী। ফলে পুরোনো তেলবাহী ট্যাংকারের দামও রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে।
তবে ড্রুরির বিশ্লেষক আনশিকা প্রজাপতির মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টি ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার প্রাথমিক পদক্ষেপ’ হতে পারে। যদিও যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় তেল রপ্তানি এখনো কম।