দ্রুত স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন গঠন করুন

· Prothom Alo

আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকার পরও দুই বছর দুই মাস ধরে দেশে কার্যকর তথ্য কমিশন নেই। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত দীর্ঘ সময় তথ্য কমিশন না থাকার নজির নেই বলে তথ্য অধিকার সম্মেলনে জানানো হয়েছে। এটি শুধু একটি সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বশূন্যতার ঘটনা নয়; বরং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারের জবাবদিহির প্রতি চরম অবহেলার প্রকাশ। এ অবস্থা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বিব্রতকর।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিককে সরকারি ও নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। কোনো কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না দিলে, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে কিংবা আবেদন গ্রহণ না করলে নাগরিক তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন। কমিশন অভিযোগের শুনানি, জরিমানা আরোপ এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারে। অর্থাৎ তথ্য অধিকার আইনের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে কমিশনের ওপর। সেই প্রতিষ্ঠানকেই দীর্ঘদিন ধরে অচল রাখা হয়েছে।

Visit turconews.click for more information.

এর পরিণতি ইতিমধ্যে স্পষ্ট। তথ্য কমিশনে প্রায় সাড়ে ৮০০ অভিযোগ জমা পড়ে আছে। কমিশনার না থাকায় এসব অভিযোগের শুনানি ও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রকাশনাও প্রায় বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটি এখন কেবল কিছু রুটিন প্রশাসনিক কাজ করছে। যে কমিশনের দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা, সেটি নিজেই সরকারি সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ তার মেয়াদে কমিশন গঠন করা হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পরও অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। গত জুলাইয়ে বাছাই কমিটি গঠন এবং পরে এক মাসের মধ্যে স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনে এমন দীর্ঘসূত্রতা গ্রহণযোগ্য নয়।

তথ্য অধিকার ব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু কমিশন না থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এক জরিপে দেখা গেছে, তথ্যের প্রয়োজন অনুভব করেন ৭২ শতাংশের বেশি নাগরিক, অথচ আইনটি সম্পর্কে জানেন মাত্র ১০ শতাংশের কিছু বেশি। আবার তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর আবেদন গ্রহণের স্বীকৃতি পাওয়ার হার ২০১৯ সালের ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশে। তথ্য পাওয়ার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এবং আইনগত সময়সীমা সম্পর্কে জ্ঞানও কমেছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে, একটি আইন কাগজে থাকলেই নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না; তার জন্য সক্রিয় প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা এবং তথ্য প্রকাশে প্রশাসনের সদিচ্ছা প্রয়োজন।

তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে অপতথ্য বা মিথ্যা তথ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব উদ্বেগজনক। তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং অপতথ্য মোকাবিলা দুটি আলাদা বিষয়। অপতথ্য রোধের অজুহাতে আইন সংশোধন করে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত করা হলে তা আইনের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করবে।

এখন আর আশ্বাস নয়, অবিলম্বে কমিশন গঠন করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ করে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে না। একই সঙ্গে জমে থাকা অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির বিশেষ ব্যবস্থা, তথ্য কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং নাগরিকদের সচেতন করার কর্মসূচি নিতে হবে।

Read full story at source