‘রিসেপশনিস্ট’ হিসেবে শুরু, এখন ‘সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং’ বিভাগের প্রধান

· Prothom Alo

‘ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে’ যখন ভর্তি হয়েছিলেন, তখনও বিষয়টা তুলনামূলক নতুন। পাঠ্যবই দেশে খুব বেশি নেই। অভিজ্ঞ শিক্ষকেরও অভাব। তবু নিজের আগ্রহ আর উদ্যমেই একেকটা ধাপ পেরিয়েছেন মোহাম্মদ তানভীর হাসান। এখন তিনি দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান। পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতা।

মোহাম্মদ তানভীর হাসান

আমার শৈশব কেটেছে নরসিংদীর পলাশে, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের একটি জুট মিলের অফিসার্স কলোনিতে। প্রকৃতি, নদী, খেলাধুলা, বইপড়া, নৌকায় ঘোরাঘুরি, মাছ ধরা, এসবের মধ্য দিয়েই বড় হয়েছি। হয়তো তখনই অজান্তেই মানুষের সঙ্গে মেশা, নতুন জায়গা দেখা, চারপাশকে অনুভব করার একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি খাতে যুক্ত হওয়ার পর ছেলেবেলার সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটা সুন্দর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি।

Visit biznow.biz for more information.

আমাদের সময়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কিংবা সরকারি চাকরিতে যাওয়া। আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছিল, শুধু একটা ডিগ্রি অর্জন করাই আমার লক্ষ্য নয়। এমন একটি বিষয় পড়তে চেয়েছিলাম, যার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সরাসরি সম্পর্ক থাকবে, নিজেকে আলাদাভাবে তৈরি করার সুযোগ থাকবে।

সেই অনুসন্ধান থেকেই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সঙ্গে পরিচয়। তখনো বাংলাদেশে এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল তুলনামূলক সীমিত।

‘ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে’ কেন পড়বেন

পথটা সহজ ছিল না। প্রয়োজনীয় বইয়ের খোঁজে আমাদের নীলক্ষেতের আনাচকানাচ ঘুরতে হতো। সীমাবদ্ধতাগুলোই আদতে আমাদের শেখার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। যা পাওয়া যেত, তার বাইরে নিজেরাও খুঁজতাম, পড়তাম এবং বোঝার চেষ্টা করতাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রি থেকে আসা খণ্ডকালীন ও অতিথি শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আইইউবিএটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এম আলিমউল্যা মিয়ানের দৃষ্টিভঙ্গিও আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছিল। তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে সক্ষমতা তৈরি করা।

ব্যবসায় প্রশাসনের পাশাপাশি লজিং, ফ্রন্ট অফিস, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানেজমেন্ট, রেস্টুরেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কালিনারি, ফুড হাইজিন, ট্যুরিজম মার্কেটিং, হসপিটালিটি ল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল লসহ নানা বিষয় আমাদের পড়ানো হতো। তবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সেবাদান ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোই আমার বেশি ভালো লাগত। তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম, হসপিটালিটি শুধু একটি হোটেল পরিচালনার বিষয় নয়; এর কেন্দ্রে আছে মানুষ, তাঁদের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (শিক্ষকের সহকারী) হিসেবেও কাজের সুযোগ হয়েছিল। হয়তো শিক্ষকতায় পা বাড়াতে পারতাম। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিই, আগে ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করব। কারণ আমার মনে হয়েছিল, শ্রেণিকক্ষে শেখা জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে না দেখলে একটি পেশাকে পুরোপুরি বোঝা কঠিন।

হসপিটালিটি শুধু একটি হোটেল পরিচালনার বিষয় নয়; এর কেন্দ্রে আছে মানুষ, তাঁদের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা।

কর্মজীবনের শুরু করি একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে। ২০০৭ সালে দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় ‘হেলথ ক্লাব রিসেপশনিস্ট’ হিসেবে যোগ দিই। আমি কখনো কোনো কাজকে ছোট করে দেখিনি। ২০০৮ সালে ফ্রন্ট অফিস বিভাগের টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পাই। ফ্রন্ট অফিসে কাজ করতে করতেই সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং এবং ক্যাটারিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

সরাসরি সেলস (বিক্রয়) বিভাগে চলে যাওয়া সহজ ছিল না। আমি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়েছি, নিজেকে প্রস্তুত করেছি। কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আমি নতুন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় শিখেছি—শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেই হয় না। বরং নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হয়, যেন সুযোগটা নেওয়ার মতো প্রস্তুত আমি থাকি।

এরপর প্রাইম ব্যাংক ও লো মেরিডিয়েনে কাজ করে ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, সেলস ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা আরও বেড়েছে। একসময় যোগ দিই দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টে। এখন সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছি। পেছনে তাকালে দেখি, প্রতিটি ধাপই পরের ধাপের জন্য আমাকে প্রস্তুত করেছে। ওয়েস্টিন আমাকে হসপিটালিটির ভিত্তি শিখিয়েছে, ফ্রন্ট অফিস মানুষের সঙ্গে কাজ করতে শিখিয়েছে, ব্যাংকিং ক্লায়েন্ট ও ব্যবসার আরেকটা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে, অন্যদিকে লো মেরিডিয়েন ও দ্য প্যালেস আমাকে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিংয়ের নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে দিয়েছে।

চালক ছাড়াই ছুটে ব্রোঞ্জ জিতেছে বাংলাদেশের গাড়ি

আমি মনে করি, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি এমন একটি সেক্টর, যেখানে মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে পরিচিতি—সবকিছুর সমন্বয় করার সুযোগ আছে। তবে শুধু চাকরির সম্ভাবনা আছে বলেই সবাইকে এই বিষয় পড়তে হবে, তা নয়। যাঁদের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগে, সেবা দেওয়ার মানসিকতা আছে, যোগাযোগ ও নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি করতে আগ্রহী এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা আছে, তাঁদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং উপাত্ত (ডেটা) নির্ভরতা হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের একজন হসপিটালিটি প্রফেশনালের শুধু প্রচলিত দক্ষতাগুলো থাকলেই হবে না। প্রযুক্তিকে বোঝা, তথ্য ব্যবহার করা, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং একই সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়াও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ট্যুরিজমের সম্ভাবনাও অনেক বড়। আমাদের প্রকৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আরও পরিকল্পিতভাবে ট্যুরিজমের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ আছে। তবে শক্তিশালী ট্যুরিজমশিল্প গড়তে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবাদানের সংস্কৃতি।

Read full story at source