কিচিরমিচির আর ডানা ঝাপটানোর শব্দে মুখর, উলিপুর যেন পাখিদের গ্রাম

· Prothom Alo

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ডানা মেলে উড়তে শুরু করে শামুকখোলের দল। কেউ যায় খাবারের খোঁজে, কেউ আবার ফিরে আসে বাসায়। দিঘির পাড়ের গাছের ডালে ডালে তাদের আনাগোনা। কখনো কিচিরমিচির, কখনো ডানা ঝাপটানোর শব্দে মুখর হয়ে ওঠে গ্রাম।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে চলনবিলের এই গ্রামের নাম উলিপুর। স্থানীয়দের মতে, কয়েক শ বছরের পুরোনো প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি দিঘিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। দিঘিটি ‘উলিপুর দিঘি’ নামে পরিচিত। দিঘিপাড়ের প্রাচীন বটগাছসহ অন্যান্য গাছে বাসা বেঁধেছে শত শত শামুকখোল। এ ছাড়া পানকৌড়ি ও ছোট কিছু পাখিও চোখে পড়ে। স্থানীয়দের কাছে উলিপুর ‘পাখিদের গ্রাম’।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

গত বুধবার বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দিঘির পাড়ের গাছগুলোয় শামুকখোলের ব্যস্ততা। কোনোটি গাছের কচি পাতায় ঠোকর দিচ্ছে, কোনোটি ডালে বসে ছানাদের আগলে রাখছে। আবার কোনোটি এক ডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে যাচ্ছে। গাছের নিচে দাঁড়ালে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় একের পর এক পাখি।

গাছের ডালে বসে আছে কয়েকটি শামুকখোল। কোনোটি স্থির, কোনোটি আবার ডানা মেলেছে। গত বুধবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামে

গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, প্রায় এক যুগ আগে শামুকখোল পাখিরা এখানে এসে গাছে গাছে বাসা বাঁধতে শুরু করে। প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। পাখিগুলো এই গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করে।

স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষক সনাতন দাশ বলেন, শামুকখোল আসার পর থেকেই গ্রামবাসী পাখিদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করেন, সে বিষয়ে সবাই সচেতন। বাইরে থেকে কেউ এলে তাঁরা নিজেরাই পাখিদের বিরক্ত না করার জন্য অনুরোধ করেন। মানুষের বসতির মাঝেই নিরাপদে আছে পাখিরা।

গ্রামের ফরিদুল ইসলাম বলেন, আগে তাঁদের আত্মীয়স্বজনই মূলত গ্রামে বেড়াতে আসতেন। এখন পাখি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন।

উলিপুরের পাখিদের ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহের আরেকটি চিত্র দেখা গেল সেখানকার বাউল আবদুল মাজেদের গানে। পাখিদের নিয়ে রচিত একটি গান গেয়ে শোনান তিনি। গ্রামের মানুষও তাঁর গান শুনতে ভিড় করেন।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘স্বাধীন জীবন’-এর পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক মাঝেমধ্যে উলিপুরে পাখি দেখতে আসেন। তিনি বলেন, শামুকখোলের দুটি প্রজাতির মধ্যে এশীয় ও আফ্রিকান প্রজাতি রয়েছে। উলিপুরে থাকা পাখিগুলো এশীয় শামুকখোল। এটি সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় আছে।

শামুকখোলের সংসার। গত বুধবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামে

আবদুর রাজ্জাক জানান, মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী শামুকখোলের প্রধান খাবার। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পাখি দেখা যায়। উপযুক্ত আবহাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ পেলে শামুকখোল সাধারণত একই এলাকায় থেকে যায়।

উল্লাপাড়া উপজেলার বাসিন্দা শিক্ষক সুমন কুমার পাল পাখি দেখতে উলিপুরে এসেছিলেন। একসঙ্গে এত শামুকখোল আগে কখনো দেখেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাখিদের এমন অবাধ বিচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। গ্রামের বাসিন্দাদের চেষ্টায় পাখিগুলো এখানে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে।’

উলিপুর দিঘিসহ একাধিক স্থানে পাখির অভয়ারণ্যের বিষয়টি জানা আছে বলে জানালেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান। পাখিদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

Read full story at source